খুলনায় ত্রিমুখী সংকটে কৃষক
শ্রমিক সংকট, দরপতনের পর বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন
উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের একটি বিলে ধান কাটছেন নারী শ্রমিকরা। ছবি: সমকাল
ডুমুরিয়া (খুলনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৪৬
খুলনার ডুমুরিয়ায় চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। ধান কাটার ভরা মৌসুমে এসে চরম শ্রমিক সংকট, ধানের আকস্মিক দরপতন এবং টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ার ত্রিমুখী সংকটে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক।
কৃষকরা বলছেন, এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি মেটানো যাচ্ছে না। ফলে অনেক কৃষক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ধান তোলার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অপেক্ষাকৃত কম মজুরির নারী শ্রমিকদের মাঠে নামাচ্ছেন।
কৃষি অফিস জানিয়েছে, গত বছর উপজেলার ২১ হাজার ৩১৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৯৫ মেট্রিক টন ধান। একই জমিতে এবারও বোরো আবাদ হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোগবালাইয়ের আক্রমণ ছাড়াই বোরোতে এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে দাবি কৃষি বিভাগের।
বুধবার বিকেলে উপজেলার ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়ন, খর্ণিয়া, আটলিয়া, ভান্ডারপাড়া, শরাফপুর, রঘুনাথপুর, গুটুদিয়া, রংপুর, মাগুরখালী, সহস, ধামালিয়া, শোভনা, রুদাঘরা ও মাগুরাঘোনা এলাকা ঘুরে জানা গেছে, গত দুই দিনের বৃষ্টিতে অনেক নিম্নাঞ্চল বোরো ক্ষেত তলিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ কৃষি বিভাগ জানাতে পারেনি। তারা বলেছেন, মাঠে সার্ভে কাজ চলছে। পরে এ তথ্য জানানো যাবে।
কৃষকদের ভাষ্য, এবার বোরো মৌসুমে সার ও বীজের সংকট ছিল না। সেচ সুবিধা এবং আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। রোগবালাইয়ের আক্রমণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়তে হয়নি বলে বোরোতে এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। এবার ফসল ভালো হলেও ঘরে ধান তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। গত বছরের সাড়ে ১২০০ টাকা মণ ধান বিক্রি করা গেছে। তার তুলনায় এবার ধানের দাম অনেক কম। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেলেও সেই তুলনায় দাম পাচ্ছেন না তাঁরা। অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে শ্রমিক সংকট, আকাশচুম্বী মজুরি ও বৃষ্টি। বর্তমান বাজারে এক মণ ধানের মূল্য ৯৫০ থেকে ১০০০ টাকা। অথচ একজন শ্রমিককে দিনে ১২০০ টাকা মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে ১০০০ টাকা মজুরি দিয়ে নারী শ্রমিক দিয়ে মাঠে ধান কাটাচ্ছেন তারা।
অনেক কৃষক তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ক্ষেতের ধান দ্রুত তোলার চেষ্টা করছেন।
বকুলতলা গ্রামের কৃষক পরিমল মন্ডল জানান, এবার দুই বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন তিনি। এতে সবমিলে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল তাঁর। এবার বোরোতে বাম্পার ফলন হয়েছে। দুই বিঘা জমিতে প্রায় ১২ মণ ধান পাবেন বলে আশা তাঁর। ধান কাটা ও পরিবহনসহ শ্রমিককে দিতে হবে প্রায় ৪ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে মাত্র ২ হাজার টাকা লাভ হতে পারে। তবে ধানের খড় (বিছালি) বিক্রি করে লাভ হতে পারে।
শরাফপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের শেখ জানান, এবার বোরোতে বাম্পার ফলন হয়েছে। এলাকায় ব্যাপক শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে।
থুকড়া গ্রামের কৃষক জবেদ আলী সানা জানান, ৩ বিঘা জমিতে এবার বোরো আবাদ করেছেন। পুরুষ শ্রমিক না পেয়ে নারী শ্রমিক দিয়ে ক্ষেতের ধান কাটছেন। পুরুষের তুলনায় নারী শ্রমিকের মজুরি কম বলে অনেক কৃষক তাদের কাজে নিয়োজিত করছেন।
উপজেলার ঘোনা গ্রামে ধান কাটা কাজে নিয়োজিত শ্রমিক আলেয়া বেগম, সুফিয়া খাতুন, মারুফা বেগম, অনিতা মন্ডল ও শান্তি বিশ্বাস জানান, পুরুষের সমান কাজ করলেও মজুরি কম দেওয়া হয় তাদের। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ক্ষেতের ধান কাটেন তাঁরা।
খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. নজরুল ইসলাম জানান, এবার বোরো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। কৃষকদের সর্বক্ষণিক প্রশিক্ষণ, মাঠ পরিদর্শন ও তাদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চলতি বোরো ধান কাটা মৌসুমে শ্রমিক সংকট রয়েছে। বৃষ্টিতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। কৃষকদের মাঠ থেকে দ্রুত ধান তোলাসহ নানা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
- বিষয় :
- খুলনা
- বোরো মৌসুম
- কৃষক
