ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নান্দাইলে পানির নিচে ৩০০ হেক্টর বোরো ধান, খাল দখলকে দুষছেন কৃষকরা

নান্দাইলে পানির নিচে ৩০০ হেক্টর বোরো ধান, খাল দখলকে দুষছেন কৃষকরা
×

ছবি: সমকাল

নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ১৯:২৬ | আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ | ১৯:৩০

ময়মনসিংহের নান্দাইলে বিল ও হাওর অঞ্চলে অধিকাংশ কৃষকের সারা বছরের খাদ্যের সংস্থান সোনালী ফসল এখন পানির নিচে। কোনো কোনো কৃষক কয়েকগুণ বেশি দামে শ্রমিক নিয়ে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পানির নিচে থাকা তাদের ধান কাটছেন। তবে বাজারে ধানের মূল্য কম থাকায় লোকসানের আশঙ্কায় অনেক কৃষক ধান না কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

স্থানীয় উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের অতিবর্ষণে এ উপজেলায় প্রায় ৩০০ হেক্টর বোরোধান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। 

কৃষকদের অভিযোগ, বিল বা হাওরের পানি নিষ্কাশনের খালগুলো ভরাট বা বেদখল হওয়াতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে মৎস্য খামার গড়ে তোলার কারণে সুষ্ঠুভাবে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় এমনটি হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। 

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর নান্দাইলের ১৩টি ইউনিয়নে মোট ২২ হাজার ২৯৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের বোরোধান আবাদ করা হয়েছে। বিল বা হাওর এলাকার যেসব কৃষকের জমি রয়েছে, সেখানে সারা বছরে একবার শুধুমাত্র বোরো ধানের চাষ করা হয়। সারা বছর পলি পড়ে থাকা ওইসব জমিতে কম পরিশ্রমে প্রচুর ধান জন্মে—যা দিয়ে অনেক কৃষক তার পরিবারের সারা বছরের অন্নের সংস্থান করেন। 

এ বছর অতিবর্ষণে হাওর-বিলসহ নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৯০০ হেক্টর জমির বোরোধান আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমির পাকা ও আধাপাকা সম্পূর্ণ ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। 

তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কাটা ধানও মাড়াই করতে পারছেন না। আবার যারা মাড়াই করছেন, সেগুলো রোদ না থাকায় নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। উপজেলা সদর থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত নোয়াবালী বিলে গিয়ে দেখা যায় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে থইথই পানি। কোথাও কোথাও কৃষকরা কোমর সমান পানিতে নেমে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটছেন। 

জমির মালিক জসিম উদ্দিন ও সবুজ মিয়া জানান, বিলের পানি নামার ব্যবস্থা বন্ধ থাকার কারণেই অতিবর্ষণে জমির ধান তলিয়ে গেছে।

রাজগাতী ইউনিয়নের যুগের হাওর ও দুল্লীবিল, গাংগাইল ইউনিয়নের দলিঘাট বিল, চণ্ডিপাশা ইউনিয়নের জালিয়া, জলা ও ছেতারা বিল, নান্দাইল ইউনিয়নের বলদা ও গজারিয়া বিল এবং খারুয়া ইউনিয়নের কালিয়াদাইর বিল ও মোয়াজ্জেমপুর ইউপির বাপাইল বিলে থাকা আধাপাকা বোরোধান পানিতে তলিয়ে গেছে। 

নাম প্রকাশ না করে বাপাইল বিলের কয়েকজন কৃষক এ প্রতিবেদককে দেখে ক্ষোভের সঙ্গে বলতে থাকেন, “আপনেরা খালি ছবি তোলার লাইগ্যা আইয়েন, খাল যে দখল হইয়া গেছে, বিলে পুকুর হইতাছে—হেইটার কিছু করতাইন পারেন না।”

রাজগাতী ইউনিয়ন পরিষদের যুগের হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক লাল মিয়া বলেন, “সারাবছর কষ্ট করে ফসল ফলাই, কিন্তু সামান্য বৃষ্টি প্রায় প্রতি বছর আমাদের সব ফসল কেড়ে নেয়। খাল দখল তো আছেই, তার ওপর হাওর বা বিলের মাঝে বড় বড় মৎস্য খামার তৈরি সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।” 

সরকারি খালগুলো দ্রুত দখলকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার করে খননের পদক্ষেপ না নিলে প্রতিবছর এমনটি হতে থাকবে বলে মনে করেন আরেক কৃষক নুরু মিয়া। 

এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ নাঈমা সুলতানা জানান, তারা মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। মূলত অপরিকল্পিত মৎস্য খামার, হাওর ও বিলপাড়ে বাড়িঘর নির্মাণ এবং খালগুলোর গভীরতা কমে যাওয়াতেই এ বছর জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া সেচ পাম্প মালিকরা খরচ বাঁচাতে দেরিতে পানি সরবরাহ করেছে। চারা রোপণে দেরি হওয়ার কারণে ধান পরিপক্ক হতে সময় বেশি লেগেছে। এ কারণেই অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে মনে করেন তিনি। 

নান্দাইল উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা শাহানা নাজনীন বলেন, প্রাকৃতিক জলাশয়ে পুকুর নির্মাণ বেআইনি কাজ। এতে স্বাভাবিকভাবে পানি নিষ্কাশন বাঁধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। কেউ এমনটি করে থাকলে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। 

আরও পড়ুন

×