ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বাংলার জয়যাত্রা

হরমুজে আটকে পড়া নাবিকদের দুঃসহ দিন

হরমুজে আটকে পড়া নাবিকদের  দুঃসহ দিন
×

 সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম 

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৮:৩৭ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ | ১০:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘পর্যাপ্ত খাবার আছে। আছে আরও দুই মাস ব্যববহার করার মতো পানি। তবু শান্তি নেই, স্বস্তি নেই। অজানা আতঙ্কে আছি। মাথার ওপর মিসাইল ও ড্রোন হামলার শঙ্কা। নেই তীরে নামার সুযোগ। প্রতিটি দিনকে মনে হচ্ছে এক মাসের মতো দীর্ঘ।  তবু পরিবারের সদস্যরা যখন ফোন করে, কথা বলি হাসিমুখে।’

সমকালের সঙ্গে আলাপচারিতায় এভাবেই মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের এক নাবিক। ৩১ নাবিক নিয়ে তাদের এই জাহাজটি ৬৪ দিন ধরে আটকে আছে। এর মধ্যে তিনবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করে তারা। তবে প্রতিবারই ব্যর্থ। 

হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বাংলাদেশের পতাকাবাহী একমাত্র জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। এই জাহাজে থাকা ৩১ নাবিক ও ক্রুর সবাই বাংলাদেশি। তবে বিদেশি মালিকানাধীন আরও চারটি জাহাজে আছে বাংলাদেশের নাবিক-ক্রু। সব মিলিয়ে পাঁচটি জাহাজে আটকা পড়েছে বাংলাদেশের ৪৯ জন।

নাবিক-ক্রুরা জানান, সাগরে মাসের পর মাস ভেসে থাকার অভিজ্ঞতা তাদের আছে। একবার যাত্রা শুরু করলে অনেকে দেশে ফিরে ৬ মাস পরে। তারপরও এবারের অভিজ্ঞতা তাদের কাছে একদম নতুন। তারা আগে কখনও এমন যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। এসব অভিজ্ঞতার কথা আগে সংবাদকর্মীকে খোলামেলা বলতেন তারা। তবে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন বিধিনিষেধ আরোপ করায় এখন আর কেউ স্বনামে কথা বলছেন না। কথা বললে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে বিএসসি।

জানতে চাইলে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর এম মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘সাগরে ভেসে থাকার অভিজ্ঞতা নাবিকদের কাছে নতুন নয়। কিন্তু এমন বিশেষ পরিস্থিতিতে কেউ যদি কোনো বিরূপ মন্তব্য করে এবং সেটি যদি গণমাধ্যমে আসে, তাহলে পুরো খাতে এর একটি নেতিবাচক প্রভাব  পড়বে। তাই গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে সাবধান থাকতে বলেছি। এটা অন্যকিছু নয়।’ জাহাজটি নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে বাধা কোথায় এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইরান থেকে অনুমতি নিতে হবে। তারা এরই মধ্যে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগও করেছে। মন্ত্রণালয় আমাদের কাছ থেকে নানা তথ্য-উপাত্তও নিয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই অনুমতি পাব।’ তিনি জানান, জাহাজে নাবিকরা সবাই স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। সবাই সুস্থ আছেন। হরমুজ প্রণালির আশপাশে থাকলেও তারা নিরাপদে আছেন। 

হরমুজ প্রণালি গিয়েও অতিক্রমের অনুমতি পায়নি ‘বাংলার জয়যাত্রা’
হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি পায়নি ‘বাংলার জয়যাত্রা’। যুদ্ধের কারণে ৩১ নাবিক নিয়ে জাহাজটি ৬৪ দিন ধরে আটকে আছে মধ্যপ্রাচ্যে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে জাহাজটি রওনা দিয়েছিল। প্রায় ৪০ ঘণ্টা জাহাজ চালিয়ে এটি হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এসেছিল। এরপর ইরান সরকারের কাছে প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি চায় জাহাজটি ভাড়া নেওয়া বিদেশি প্রতিষ্ঠান। তবে তেহরান তা প্রত্যাখ্যান করে। তখন জাহাজটি ঘুরিয়ে আবার আগের অবস্থানের কাছাকাছি স্থানে নিয়ে যায় বাংলাদেশের নাবিকরা।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, জাহাজে যে সার রয়েছে, তার গুণগত মান দুই মাস পরও অক্ষত থাকবে। এর মধ্যে একটা সুরাহা করে ফেলবে কূটনৈতিক চ্যানেল। 

জাহাজে থাকা ৩১ নাবিকের মনোবল চাঙা আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার মজুত আছে। তবে পানির ব্যবহার রেশনিং করে দৈনিক ৬ টনে নামিয়ে আনা হয়েছে। জাহাজটি প্রতিদিন ১৮ টন সামুদ্রিক পানি পরিশোধন করতে পারে। এজন্য ইঞ্জিন পুরোদমে চালু রাখতে হয়।

বাড়ানো হয়েছে সুযোগ-সুবিধা
সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রসঙ্গে বিএসসির এমডি বলেন, ‘নাবিকদের মনোবল শক্ত রাখার জন্য আমরা বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। পরিবারের সঙ্গে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে পারছেন। দৈনিক খাবারের বরাদ্দ জনপ্রতি ৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২ ডলার করা হয়েছে। বেসিকের সমপরিমাণ ওয়ার অ্যালাউন্সও দেওয়া হচ্ছে তাদের।’
ভারত থেকে পণ্য বহন করে গত ২ ফেব্রুয়ারি হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে বাংলার জয়যাত্রা। পরে কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায় জাহাজটি। এর পরদিনই ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এতে আটকা পড়ে জাহাজটি। গত ১১ মার্চ জেবেল আলী বন্দরে জাহাজটি থেকে পণ্য খালাস শেষ হয়। এরপর এটি কুয়েতের একটি বন্দরে নতুন করে পণ্য বোঝাই করার সূচি ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে নিরাপদে জাহাজটি ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসসি। যুদ্ধবিরতি আলোচনার পর এটি সম্ভব হবে বলে মনে করেছিল তারা। কিন্তু হরমুজ প্রণালির মুখ পর্যন্ত গিয়েও ফেরত আসতে হচ্ছে তাদের। ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে জাহাজটির দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে যাওয়ার কথা।  

কেন হরমুজ প্রণালিতে এখানে আটকা পড়ছে জাহাজ
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরে যাওয়ার একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশপথ। এর এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই পথ ধরে জাহাজগুলো আরব সাগরে তথা ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন বলছে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়। অর্থাৎ এই প্রণালি দিয়ে যায় প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয় এই প্রণালি দিয়ে। এটি বন্ধ হওয়ায় কয়েক দিন ধরেই তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস বলেছিল, ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ ডলার ছাড়াতে পারে। আবার ভারতের ইকুইরাস সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সরবরাহ পথ বন্ধ হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ থেকে ১৩০ ডলারে উঠে যেতে পারে। শর্তসাপেক্ষে এখন কিছু জাহাজ চলাচল করলেও দেড়শর বেশি ট্যাঙ্কার আটকে আছে এই প্রণালির দুই পাশে। 

 

আরও পড়ুন

×