ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দাম নেই, হিমাগারেও রাখা যায়নি ঘরে রাখা আলু পচে সর্বনাশ

দাম নেই, হিমাগারেও রাখা যায়নি ঘরে রাখা আলু পচে সর্বনাশ
×

বৈরী আবহাওয়ায় আলু পচে যাওয়ায় ফেলে দেওয়া হয় রাস্তায়। গঙ্গাচড়া উপজেলার চেংমারী গ্রাম সমকাল

আলতাফ হোসেন দুলাল, রংপুর

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৭:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় আলু নিয়ে বিপদে পড়েছেন চাষিরা। উৎপাদন খরচ দূরের কথা, হিমাগারে সংরক্ষণ ভাড়ার টাকাও উঠছিল না-এই হিসাব কষেই অনেক চাষি আলু হিমাগারে না রেখে বাড়িতেই বস্তাবন্দি করে রাখেন। কিন্তু দেড় মাস না যেতেই সেই আলু এখন হয়ে উঠেছে গলার কাঁটা। পচে যাওয়া শত শত বস্তা আলু রাস্তার পাশে ও বাড়ির আশপাশে ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে দুর্গন্ধ। অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষিরা।
বাজারদর পতন, সংরক্ষণ সংকট ও পরিকল্পনার অভাবে রংপুরে আলুচাষ এখন অনেকের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ব্যবস্থা না নিলে আগামী মৌসুমে আলু চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন তারা– এমন আশঙ্কা করেছেন খোদ চাষিসহ সংশ্লিষ্টরা। 

উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে স্টারিং, গ্রানুলা ও টিবিএস জাতের আলু উৎপাদনে কৃষকদের কেজিপ্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ১৮ থেকে ২০ টাকা। অথচ আলু তোলার সময় পাইকারি বাজারে তা বিক্রি হয়েছে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় টাকায়। এখনও বাজারে একই দাম চলছে। অন্যদিকে, গত বছর হিমাগারে আলু সংরক্ষণের সরকারি ভাড়া ছিল কেজিপ্রতি ৬.৭৫ টাকা। এ বছর ভাড়া আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চাষিরা। ফলে লোকসানের ভয়ে অনেকেই হিমাগারে আলু না রেখে বাড়িতে সংরক্ষণ করেন। ঘরে রাখা সেই আলু পচে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন চাষিরা।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গঙ্গাচড়ার চেংমারি ও কুড়িয়ারমোড় গ্রামে সবচেয়ে বেশি আলু পচে গেছে। ওই দুই গ্রামের অন্তত দুই শতাধিক চাষির শত শত বস্তা আলু ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।
কুড়িয়ারমোড় গ্রামের কিষানি মর্জিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘দেড় একর জমিতে ২৩০ বস্তা আলু পাইছিলাম। দুইটা গরু বেচে চাষ করছি। হিমাগারে রাখিনি, ভাড়া দিতে পারমু না ভেবে। দেড় মাসেই সব আলু পচে গেল। ৮৩ হাজার টাকার আলু নষ্ট হলো। গরুও গেল, আলুও গেল।’ চেংমারি গ্রামের কৃষক রানা মিয়া বলেন, ‘এক একর জমির ১৩৯ বস্তা আলু ঘরে রাখছিলাম। সব পচে গন্ধে থাকা যায় না, পরে রাস্তার ধারে ফেলে দিছি। এতে ৫০ হাজার টাকার লোকসান হয়েছে।’

পচা আলু রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়ায় এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। পথচারীদের নাক-মুখ ঢেকে চলাচল করতে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ‘দুর্গন্ধে বাড়িতে থাকা যাচ্ছে না।’ 
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এ বছর উপজেলায় পাঁচ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে এক লাখ ৫৪ হাজার ২০৭ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। অথচ সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার সুবিধা সীমিত। এ কারণে আলু পচে নষ্ট হয়েছে। উপজেলার কুড়িয়ারমোড় ও চেংমারি গ্রামের দুই শতাধিক কৃষকের অন্তত ১৪ হাজার বস্তা আলু পচে নষ্ট হয়েছে। বর্তমান বাজার অনুযায়ী ওই আলুর দাম ৫০ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হুসেন বলেন, ‘সঠিকভাবে শুকিয়ে পরিকল্পিতভাবে নেটের বস্তায় রাখলে চার মাস পর্যন্ত আলু ভালো থাকার কথা। তবে এবার আলু তোলার সময় কিছু এলাকায় বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ায় দ্রুত পচন ধরেছে।’ 
আলু পচে যাওয়ায় কাইয়ুম আলী, চান মিয়া, মতলেব হোসেন, পারভীন আক্তারসহ শতাধিক চাষি চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন, এখন তা পরিশোধ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তারা সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ ও ঋণের দাবি জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন

×