হাওরে কৃষকের হাহাকার
‘এই ধান বেপারি নেয় না, সরকারও নেয় না’
ছবি: সমকাল
মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ১৯:৪০ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ২০:০৭
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন ও ইটনা উপজেলার হাওরাঞ্চলে হঠাৎ বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পানিতে তলিয়ে ধান পচে যাচ্ছে, রোদ না থাকায় কাটা ধান শুকাতেও পারছেন না কৃষকরা।
এদিকে উৎপাদন ও শ্রমিকের খরচ বহুগুণ বাড়লেও বাজারে ধানের দাম তলানিতে। সরকারি গুদামেও ‘আর্দ্রতার অজুহাতে’ ধান দিতে পারছেন না কৃষকরা।
কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে ঘাগড়া ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক জপন দেবনাথের সঙ্গে ধানের মাঠে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘ফুরদিঘা, বেহারকোনা, কাশিদ্দাপুর হাওরে ৩ খানি ক্ষেত করছিলাম। পইলা মেঘের মধ্যে বাপ-পুত আমরা দেড় খানি ক্ষেত কাটছিলাম। অহন এই ধান বেপারিও নেয় না, সরকারও নেয় না। কিতা করতাম! জি, পুত লইয়া কি খামু!’
এই কৃষক আরও বলেন, ‘এই তিন খানি জমি চাষ করতে মোট ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। যে দেড় খানি কাটা হয়েছে মেঘের মধ্যে, সেই ক্ষেতে ৬০ মন ধান হয়েছে। বর্তমানে ৬০০ টাকা ধরে ৬০ মনের দাম ৩৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা কিস্তি এনেছিলাম। কিস্তি দিতে গিয়ে ৩৬ হাজার টাকার ধান বেচেছি।’
চেষ্টা করেও সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে ধান বিক্রি করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন এই কৃষক।
একই সুরে কথা বলেন স্থানীয় আরেক কৃষক রবীন্দ্রনাথ দেবনাথ। তিনি বলেন, ‘আমাদের ধান সরকারও নিতো না, আবার গরু-বাছুর বেচে মহাজনের ঋণ শোধ করতে হবে, না খাইয়া থাকতে হবে। এমনিতেই আমাদের পরিবারের সদস্যরা বছরের অধিকাংশ সময় ফেনী ও কুমিল্লায় কাজে চলে যায় বাঁচার তাগিদে।’
ইটনা উপজেলার বরি বাড়ি গ্রামের কৃষক সৈকত আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘ক্ষেতে পানি আছে। অনেক কষ্টে ধান কেটে আনছি। কিন্তু রোইদ নেই। ধান শুকানোর জায়গা পানির তলে। রোইদ উঠলে হাওরের পানি নামার সম্ভাবনা কম। নদীর পানি প্রতিদিন বাড়ছে।’
মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী প্রতি একরে গড় ফলন হয়েছে ৬০ মন। কিন্তু এই আবহাওয়ার কারণে ঘরে ধান তোলা কৃষকদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটতে শ্রমিক সংকট, অন্যদিকে পানির মধ্যে আধুনিক মেশিন দিয়েও ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না।
মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, একর প্রতি ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে কৃষকদের। এদিকে সরকারি ক্রয় মূল্য মণ প্রতি ১,৪৪০ টাকা নির্ধারণ থাকলেও তার সুফল পাচ্ছে না চাষিরা। কৃষকের অভিযোগ, গোদামে ধান দিতে গেলে আর্দ্রতা পরিমাপ এবং ব্যাংক হিসাবের জটিলতায় পড়তে হয়।
মিঠামইন খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, ধান সংগ্রহের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ আর্দ্রতার শর্ত দেওয়া হয়েছে। শুকাতে না পারায় কৃষকদের ধানে আর্দ্রতা পাওয়া গেছে ২০-২২ শতাংশ। ২৭ টন ধান ক্রয় করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী সপ্তাহ থেকে ধান আসবে।
ধান ক্রয় সংগঠনের সভাপতি (যাদেরকে দেশীয় ভাষায় বেপারি বা ফরিড়া বলা হয়) ব্যাপারী দুর্বাজ মিয়া জানান, বর্তমান ভেজা ধান ৬০০ টাকা মনের ধরে ক্রয় করি। ভৈরব, আশুগঞ্জ, ওই সকল আড়তে আমরা ধান পাঠাই। ভালো ধান না হলে আড়তদার নিতে চায় না। অন্যদিকে চালের মিল মালিকরা এসব ধান কিনতে চাই না। ভালো ধান না হলে দাম কম হবেই।
