শামছুল হক সেতুর টোল বন্ধের দাবি চার উপজেলাবাসীর
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মিত শামছুল হক সেতুতে চলছে টোল আদায় সমকাল
আবদুর রহিম, টাঙ্গাইল
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৮:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মিত এলাসিন শামছুল হক সেতু টোলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন চার উপজেলার লোকজন। দাবি আদায়ে বিভিন্ন সময় সভা-সমাবেশ করেছেন তারা। জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন। সেতুটি টোলমুক্ত হলে টাঙ্গাইলের নাগরপুরসহ মানিকগঞ্জের দৌলতপুর ও সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার কয়েক লাখ লোকের যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম হবে।
তিন দিক নদীবেষ্টিত নাগরপুর ছিল একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। একটি সেতুর অভাবে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগে ছিলেন নাগরপুরবাসী। ফলে ধলেশ্বরী নদীর ওপর সেতু নির্মাণ ছিল নাগরপুরবাসীর কাছে একটি স্বপ্ন। সেখানে টোল আদায় কাঙ্ক্ষিত ছিল না। টোল আদায় নিয়ে ইজাদারের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই গাড়িচালকদের ঝগড়া-বিবাদ হয়। এ ছাড়া বেশি টোল আদায় করার অভিযোগ রয়েছে।
টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্যমতে, দীর্ঘদিন নৌকা দিয়ে ধলেশ্বরী নদী পারাপার হতো চার উপজেলা– দেলুদয়ার, নাগরপুর, চৌহালী ও দৌলতপুরের কয়েক লাখ মানুষ। কষ্টের সীমা ছিল না। ১৯৯২ সালে ফেরি দিয়ে নদী পারাপার শুরু হয়। ২০০৯ সালের ১৬ মার্চ সেতু নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ৫১৫ দশমিক ১২ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ দশমিক ২৫ মিটার প্রস্থ সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৩৫ কোটি ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৫২৭ টাকা। কাজটি পায় আবদুল মোনেম লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ৩০ মাসের মধ্যে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়ে একই বছরের ১২ অক্টোবর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এদিকে নদী শাসন ও প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে পারিসা ট্রেড সিস্টেম লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। সেতুর নাগরপুর প্রান্তে দুই কিলোমিটার এবং এলাসিন প্রান্তে ৪০০ মিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলে ২০১৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন ও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের নামে নামকরণের ঘোষণা দেন। শুরু হয় যানবাহন চলাচল। টোল কার্যক্রমও শুরু হয়। ১০ চাকার গাড়ি ৩০০, হেভি ট্রাক ১৮০, মিডিয়াম ট্রাক ১৫০, বড় বাস ১৩৫, মিনি ট্রাক ১১৫, কৃষিকাজে ব্যবহৃত যান ৯০, মিনিবাস ৭৫, মাইক্রোবাস ৬০, চার চাকার যানবাহন ৬০, সিডান কার ৪০, অটোরিকশা ১৫, মোটরসাইকেল ১০ ও রিকশা, ভ্যান, বাইসাইকেল ৫ টাকা করে টোল নির্ধারিত হয়।
স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে সেতুর নির্মাণ খরচ উঠে গেছে। সুতরাং টোল আদায় বন্ধ করা দরকার। সম্প্রতি টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য রবিউল আওয়ালও সেতুটি টোলমুক্ত করতে সংসদে বক্তব্য দেন। বর্তমানে এস এম জাহাঙ্গীর নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাত কোটি ৬৩ লাখ টাকা দিয়ে সড়ক বিভাগ থেকে দুই বছর পাঁচ মাসের জন্য ইজারা নিয়ে টোল আদায় করছে। ২০২৬ সালের জুনে তাদের মেয়াদ শেষ হবে। ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় সপ্তমবারের মতো দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা টোলঘর ভাঙচুর করে টোল আদায় বন্ধ করে দেয়। পরে সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ছাত্র-জনতার সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন। তবে স্থায়ীভাবে টোল বন্ধ, সেতুর সংস্কার, জননিরাপত্তা নিশ্চিতসহ ১০ দফা দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন নাগরপুরবাসী। সম্প্রতি টোল বন্ধের দাবিতে নাগরপুর সরকারি কলেজ গেট এলাকায় মানববন্ধন করা হয়। অটোরিকশাচালক শাহাদত দেওয়ার বলেন, ‘সেতু বানাইতে যে খরচ হইছে, সেই টাকা উঠে গেছে। এখন সরকারের উচিত এই সেতু থেকে টাকা না নেওয়া।’
ট্রাকচালক রফিকুল ইসলাম জানান, এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করতে প্রায় ৪০০ টাকা লাগে। যে ভাড়া পান, ওই টাকা দিয়ে পোষায় না। এ কারণে টোলমুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছেন তারা।
টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. সিনথিয়া আজমিরী খানের ভাষ্য, ২০১৪ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০০ মিটারের অধিক দৈর্ঘ্যের সেতুতে টোল আদায় হয়। সেই অনুযায়ী ৫১৫ দশমিক ১২ মিটার দীর্ঘ এই সেতু থেকে টোল আদায় হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে টোলমুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছেন এলাকার লোকজন। দাবির মুখে আলোচন করে একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
- বিষয় :
- টোল
