২৩ কোটি টাকার ভবন মৎস্য বিভাগের ‘গলার কাঁটা’
নাসির লিটন, ভোলা
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভোলায় বিশ্বব্যাংকের ঋণের টাকায় নির্মিত মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও সার্ভিলেন্স চেকপোস্টের বড় বড় ভবন অকেজো পড়ে আছে। জেলেদের উন্নয়নে মেঘনার তীরে প্রায় ২৩ কোটি টাকার এ প্রকল্পে নির্মাণকাজেও ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। যে ঘাটে অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে আসে না জেলে নৌকা-ট্রলার; নেই আসা-যাওয়ার জন্য সহজ রাস্তাও। ভবনগুলোর ব্যবহার নিয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারছে না স্থানীয় মৎস্য বিভাগ।
মৎস্য অধিদপ্তরের সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের আওতায় ভোলা সদর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামে (কাঠির মাথা) মেঘনার তীরে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। ভবনের সামনেই বিশাল চর। বড় কোনো নৌযান সেখানে ভিড়ে না। তাই এই ঘাটে মাছ খালাস করা বা বেচাকেনা অসম্ভব।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের ঋণের টাকায় সদর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামে ও লালমোহন উপজেলার বুড়িরদোন মাছঘাটে দুটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। একই প্রকল্পের আওতায় চরফ্যাসন উপজেলার চর কচ্চপিয়ায় সার্ভিলেন্স চেকপোস্ট, চিংড়ি হ্যাচারি ও পন্টুন নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোর নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২৩ কোটি টাকা। এতে জেলেদের বিশ্রামাগারসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা নেই। নির্মাণ শেষে চলতি বছরের মার্চ মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনগুলো স্থানীয় মৎস্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছে। তবে এগুলো যেন মৎস্য বিভাগের ‘গলার কাঁটা’। ভোলা জেলা মৎস্য অফিসে এ প্রকল্পের কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে, নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলছেন স্থানীয়রা। চুক্তি অনুযায়ী জেনারেটর, মিনি হিমাগার, ডিজিটাল স্কেল, বরফ প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থাসহ মূল্যবান যন্ত্রপাতি না দিয়েই বিল তুলে নেন ঠিকাদার। এ ছাড়া ভবনের স্থান নির্ধারণ নিয়েও বিস্তর অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
ঘাটের জেলে মফিজুল ইসলাম বলেন, কাঠির মাথায় ৩০ থেকে ৪০টি ছোট নৌকা ও ট্রলার রয়েছে। এরা দৈনিক দু-তিন হাজার টাকার মাছ পায়। ওই মাছ বেচাকেনার জন্য বড় ভবন আর বিশাল আয়োজনের কোনো দরকার নেই। এটি চালু হলেও জেলেরা এখানে মাছ বিক্রি করতে আসবেন না। এ ভবনে মাছ বিক্রি করলে ট্যাক্স দিতে হবে। দরিদ্র জেলেরা নদীর পাড়েই মাছ বিক্রি করতে পারেন। তারা ট্যাক্স দিতে আসবেন কেন?
ঘাটের আড়ত মালিক মো. সিরাজ মালেক বলেন, এটি যে পরিবেশে তৈরি করেছে, তা ব্যবসায়ী ও জেলেদের কোনো কাজে আসবে না। জেলে মিজান জানান, চালুর আগেই ভবনের বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। নির্মাণের সময় মৎস্য বিভাগের কোনো তদারকি ছিল না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের ইচ্ছামতো কাজ করেছে।
স্থানীয় ইউপি মেম্বার ও জমিদাতা মো. মনির খান জানান, যেভাবে কাজ করার চুক্তি করেছে, তার অনেক কিছুই হয়নি। অবতরণ কেন্দ্রে জেনারেটর, স্কেল, বরফকল, হিমাগার, কমিউনিটি সেন্টার
করার কথা ছিল। কিন্তু এর কিছুই নেই।
জেলেদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না বসালেও মৎস্য কর্মকর্তাদের কক্ষে এসি লাগানো নিয়ে জেলেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
লালমোহনের বুড়িরদোনে গিয়ে দেখা যায়, মেঘনার তীরে বিশাল আকৃতির একটি পাকা ভবন। নদীর ঢেউ আছড়ে পড়ছে ভবনের দেয়ালে। চারদিকে নীরবতা। বড় বড় তালা ঝুলছে ভবনের গেটগুলোতে। যাতায়াতের কোনো রাস্তা নেই। স্থানীয়রা জানান, জেলেদের উন্নয়নে ভবনটি করা হয়েছে বলে তারা শুনেছেন।
অবতরণ কেন্দ্র দুটিতে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানান ঠিকাদার। এ ছাড়া চর কচ্চপিয়ার সার্ভিলেন্স চেকপোস্ট, চিংড়ি হ্যাচারি ও পন্টুনে আরও ১০ কোটি টাকা খরচের তথ্য মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে। তবে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার শহিদুল ইসলাম জানান, সদর উপজেলার ভবানীপুর অবতরণ কেন্দ্রের জন্য এক কোটি টাকা ও লালমোহনের বুড়িরদোন কেন্দ্রে প্রায় তিন কোটি টাকা বেশি খরচ করেছেন। রিভাইজের জন্য কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছেন। অনুমোদন না হওয়ায় তিনি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। যন্ত্রপাতি না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বরাদ্দের মধ্যে যা যা ছিল, তা দিয়েছেন। মৎস্য বিভাগের একাধিক ইঞ্জিনিয়ার কাজের তদারকি করেছেন।
ভোলা জেলা মৎস্য অফিসে এ প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্দিষ্ট করে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। মৎস্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে এ প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে দেখানো আছে। তবে ব্যয়- বরাদ্দের কোনো তথ্য নেই। বাস্তবায়নকালের বিষয়ে তথ্য আছে, ২০১৮ সালের জুলাইতে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গত ১২ মার্চ স্থাপনাগুলোর কাগজপত্র বুঝে নিয়েছেন। কাজের কোনো নকশা ও মালপত্রের কোনো তালিকা তাঁকে দেওয়া হয়নি। পুরো কাজের তদারকি করেছে প্রকল্প দপ্তর। জেলেদের সম্পৃক্ত করতে পারলে এর সুফল আসবে বলে তিনি মনে করেন। ভুল স্থান নির্ধারণসহ অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি ছয় থেকে সাত মাস হলো। ভবন হস্তান্তর হলেও এখনও কোনো জনবল বা রক্ষণাবেক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। ভবনগুলো চালু করার পরিকল্পনা আছে। এটি এখনও প্রক্রিয়াধীন। তবে কোনো কাগজপত্র জেলা অফিসে নেই।’
- বিষয় :
- মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ
