সুন্দরগঞ্জে জলাতঙ্কে ৫ মৃত্যু
পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে অন্ধকার
স্বামী ফুল মিয়ার মৃত্যুর পর দুই মেয়েকে নিয়ে দিশেহারা জমিলা খাতুন সমকাল
এ মান্নান আকন্দ, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ১৭ মে ২০২৬ | ০৮:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
মেয়ের বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলেন ফুল মিয়া। চলতি বোরো মৌসুম শেষে মেয়েকে তুলে দেওয়ার জন্য সব ঠিকঠাক করে রেখেছিলেন। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার আগেই জলাতঙ্কে মারা যান ফুল মিয়া। পরিবারের কর্তাব্যক্তিকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন তাঁর স্ত্রী জমিলা খাতুন। মেয়েকে কীভাবে তুলে দেবেন তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামের ফুল মিয়াকে গত ২২ এপ্রিল কুকুর কামড়ায়। সেদিন দুটি সরকারি হাসপাতাল ঘুরে তিনি জলাতঙ্কের টিকা পাননি। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শে বাইরে থেকে কিনে টিকা দিয়েছিলেন। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় কুকুরের কামড়ে আরও ১৫ জন আহত হন। বাইরে থেকে কিনে টিকা নেওয়ার পর তাদের মধ্যে আরও চারজনের মৃত্যু হয়। মৃত অন্যরা হলেন সুলতানা বেগম, রতনেশ্বর, নন্দ রানী ও আফরুজা বেগম।
গতকাল শনিবার বজড়া কঞ্চিবাড়ি গিয়ে প্রথমে কথা হয় স্বামীহারা জমিলা খাতুনের সঙ্গে। এ সময় তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘কয়েক মাস আগে ছোট মেয়ে ফেন্সির বিয়ের কাবিন করে রেখেছি। চলতি বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ের পর মেয়েকে তুলে দেওয়ার কথা। কিন্তু হঠাৎ এক পাগলা কুকুরের তাণ্ডবে সব তছনছ হয়ে গেল।’
জমিলা খাতুনের দুই মেয়ে– ফাইমা ও ফেন্সি। এক বছর আগে ফাইমার বিয়ে হয়ে গেছে। পরিবারের কর্তার মৃত্যুর পর কিছু জমিজমা থাকলেও তা দেখভালের কেউ নেই। ফেন্সি বলেন, ‘আমি ছোট মেয়ে। বাবা আমাকে অনেক ধুমধাম করে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। এখন সব এলোমেলো হয়ে গেল। এই দুঃখ রাখব কোথায়, আর কাকে বা বলব। আমরা অভিভাবক শূন্য হয়ে গেলাম।’
মৃত সুলতানা বেগমের স্বামী সালাম মিয়া বলেন, ‘আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে বিয়ে করেছে। মেয়েটি ছোট। ছোট বয়সেই সে এতিম হয়ে গেল। মা মরা মেয়েকে এখন কে দেখভাল করবে। আমি রোজগারে ব্যস্ত থাকতাম। কিন্তু সংসার ঠিক রাখত স্ত্রী। সে আজ নাই। মেয়েটিকে নিয়ে কঠিন দুশ্চিন্তা হয়।’
মৃত রতনেশ্বরের মা রংমালা রানী বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছেন। ছেলের কথা জিজ্ঞেস করতেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। তিনি জানান, রতনেশ্বর ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। বসতভিটা ছাড়া আবাদি জমি নেই তাঁর। রতনেশ্বরের একমাত্র ছেলে মিলন। তিনি বিয়ে করেছেন। তিনিও কাঠমিস্ত্রি। রতনেশ্বরের স্ত্রী শোভারানী বলেন, জীবন কীভাবে কাটবে সে চিন্তায় তিনি দিশা পাচ্ছেন না।
মৃত নন্দ রানীর ছেলে কনক ঢাকায় গার্মেন্টে চাকরি করত। কনকের মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে থাকতেন নন্দ রানী। নন্দ রানীর এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে বেশ আগে। বাড়ি দেখভাল করতেন নন্দ রানী। তাঁর ছেলে কনক বলেন, ‘মা মারা যাওয়ার পর আমার মেয়েটি ঠাকুরমার শোকে পাথর হয়ে গেছে।’
মৃত আফরুজা বেগম তিন ছেলের জননী ছিলেন। টানাটানির সংসারে অনেক কষ্ট করে ছেলেদের লেখাপড়াসহ ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু মাকে হারিয়ে তিন ভাই শোকে কাতর। সমকালের সঙ্গে কথা বলেন আফরুজার বড় ছেলে মনোরুল ইসলাম। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি বলেন, ‘মাকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। বাবা (মতিয়ার রহমান) এখন সঙ্গহীন হয়ে পড়েছেন।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘কাকে বিচার দেব? আর বিচার দিয়েই বা কী লাভ হবে। আমার মায়ের মতো আর কাউকে যেন এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়।’
গত ২২ এপ্রিল বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামের ১৬ জনকে কুকুর কামড়ায়। ঘটনার ১৪ দিন পর গত ৬ মে নন্দ রানী ও ফুল মিয়া এবং ৮ মে রতনেশ্বর মারা যান। গত ১১ মে উপজেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য বিভাগ বিষয়টি জানার পর মৃত পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়। এরপর ১১ মে রাতে আফরুজা বেগম এবং সর্বশেষ ১৩ মে সুলতানা বেগমের মৃত্যু হয়। পরে তাদের পরিবারকেও ১০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়।
গত শুক্রবার গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ)
আসনের এমপি মো. মাজেদুর রহমান ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা
বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামে কুকুরের কামড়ে মৃত পাঁচজন এবং আক্রান্ত ৯ জনের পরিবারের সদস্যদের ইউনিয়ন পরিষদে ডেকে নিয়ে খোঁজখবর নেন। সেই সঙ্গে মৃত প্রত্যেকের পরিবারকে ১৫ হাজার এবং আক্রান্ত প্রতিটি পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেন। এর আগে স্থানীয় এমপি ও উপজেলা প্রশাসন মৃত পাঁচ পরিবারের বাড়িতে গিয়ে ১০ হাজার টাকা করে দেন। এ ছাড়া জলাতঙ্ক প্রতিরোধে টিকা কেনার জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
- বিষয় :
- মৃত্যু
