ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

হুইলচেয়ারে বসেই বড় স্বপ্ন দেখেন জাহিদ

হুইলচেয়ারে বসেই বড় স্বপ্ন দেখেন জাহিদ
×

হুইলচেয়ারে বসে আছেন ওয়েব ডেভেলপার জাহিদ হাসান। ছবি: সমকাল

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ | ১০:০৮ | আপডেট: ১৮ মে ২০২৬ | ১০:৩৬

একসময় দৌড়ে স্কুলে যেতেন জাহিদ হাসান। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, পড়াশোনা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন এই তরুণ। কিন্তু সামান্য জ্বর বদলে দিয়েছে তাঁর পুরো জীবন। ভুল চিকিৎসার নির্মম পরিণতিতে কোমরের নিচ থেকে অবশ এই মেধাবী তরুণের। তবুও স্বপ্ন দেখার সাহস হারাননি জাহিদ। উদ্যমী এই তরুণ বিছানায় শুয়েই কম্পিউটারের জটিল সব কোডিং ব্যবহার করে ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং করছেন।

সুনামগঞ্জ শহরতলির মাইজবাড়ি এলাকার কৃষক জাকির আহমদ ও গৃহিণী কুসবুল বেগমের বড় ছেলে মেধাবী জাহিদ হাসান। পড়াশোনা করতেন ঐতিহ্যবাহী সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে।

২০১৫ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। পরিবারের লোকজন দ্রুত সুস্থতার আশায় স্থানীয় এক হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। সেই চিকিৎসাই তাঁর কাল হয়ে উঠে। অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ও সাপোজিটরি ব্যবহারের পর শুরু হয় শরীরে তীব্র খিঁচুনি। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সিলেটে পাঠানো হলেও ততক্ষণে গলা থেকে নিচ পর্যন্ত অবশ হয়ে পড়ে।

এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ সংগ্রাম। সিলেট, ঢাকা ও ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে টানা দুই বছর চিকিৎসা চলে। এর পরও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি জাহিদ। অসুস্থতা তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি। বিছানায় শুয়েই বই হাতে নিয়েছেন। পড়াশোনায় দুই বছর বিরতি থাকলেও ২০১৭ সালে মাত্র ১৫ দিন পড়াশোনা করে জেএসসি পরীক্ষায় ৪.৪৩ পয়েন্ট অর্জন করেন। এরপর ২০২০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এবং ২০২২ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.৬৭ পয়েন্ট পেয়ে সবাইকে চমকে দেন। 

স্বপ্ন আরও বড় হয়, যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। গ্রামের মানুষ, আত্মীয়স্বজন সবাই গর্বে ভরে ওঠেন। কিন্তু ভাগ্য যেন বারবার তাঁকে থামিয়ে দিতে চেয়েছে। শারীরিক জটিলতা বাড়তে থাকায় মাত্র তিন মাস পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে সুনামগঞ্জে ফিরে আসতে হয় তাঁকে।

জাহিদ হাসান বলেন, ‘শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে প্রায় তিন মাস পড়াশোনাও করেছি। কিন্তু আমার শারীরিক অবস্থার কারণে সার্বক্ষণিক একজন মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। আমার মা ছাড়া দেখাশোনা করার মতো আর কেউ নেই। তাই বাধ্য হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে বাড়িতে ফিরে আসতে হয়েছে।’

জাহিদ আরও বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি বিছানায় শুয়েই ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে অনলাইনে কাজ করার চেষ্টা করছেন। অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে অনেক ক্লায়েন্ট কাজ শেষ হওয়ার পরও টাকা দেয় না। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, এখন আমার একটাই ইচ্ছা, সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরা। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে কিছু করতে চাই। আর আমার মতো অসহায় ও শারীরিক অক্ষম মানুষদের পাশে দাঁড়াতে চাই।

জাহিদের পরিবার জানায়, চিকিৎসকরা তাদের পরামর্শ দিয়েছেন উন্নত চিকিৎসার জন্য জাহিদকে দেশের বাইরে বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।  ইতোমধ্যে চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়েছে তারা। 

জাহিদের মা কুসবুল বেগম বলেন, ছেলেকে সুস্থ করতে জমিজমা, গরু-বাছুর, যা ছিল সবই বিক্রি করেছেন। মানুষের সহযোগিতা, ঋণ আর সহায়-সম্পদ বিক্রি করে এতদিন চিকিৎসা চালিয়েছেন। চিকিৎসকরা বলেছেন, জাহিদকে পুরোপুরি সুস্থ করতে আরও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন, যার জন্য আরও এক কোটি টাকা লাগবে। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে হয়তো ছেলেটার চিকিৎসা করানো সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

×