ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

জেলায় মোট হাট ১২৬টি

বগুড়ার হাটে চার শতাধিক অবৈধ স্থাপনা

বগুড়ার হাটে চার শতাধিক অবৈধ স্থাপনা
×

হাটের জমিতে নিয়ম অমান্য করে নির্মাণ করা হচ্ছে পাকা স্থাপনা। নির্মাণের আগেই এখানকার প্রতিটি দোকানের পজেশন বিক্রি হয়েছে ১০ লাখ টাকায়। মঙ্গলবার বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থান হাটে সমকাল

এস এম কাওসার, বগুড়া

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৯:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার হরিখালী হাটের পাঁচ শতাংশ জমি কয়েক বছর আগে দখল করেন মধুপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান অসীম কুমার। সেই জমিতে কয়েকটি দোকান ছাড়াও তিনতলা বসতবাড়ি তৈরি করেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই আত্মগোপনে আছেন তিনি। একই উপজেলার করমজা হাটের দেড় শতাংশ জমি দখল করেছেন গোলাম রব্বানী। আরও দুই ব্যক্তি দখল করেছেন দুই শতাংশ করে জমি।

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের হাটবাজার শাখা সূত্রে জানা গেছে, বগুড়ায় ছোটবড় মিলিয়ে হাট আছে ১২৬টি। এসব হাট থেকে প্রতি বছর সরকারের রাজস্ব আদায় হয় শতকোটি টাকার বেশি। হাটের জায়গায় প্রশাসন যে সেট নির্মাণ করে দেয়, এর বাইরে কারও দোকানঘর বা বাসাবাড়ি নির্মাণের অনুমতি নেই। কিন্তু জেলার বেশির ভাগ হাটেই এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। প্রতিটি হাটেই চার-পাঁচটি করে স্থাপনা আছে। সব মিলিয়ে জেলার সরকারি হাটে অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা চার শতাধিক।

সোনাতলার করমজা হাটের সাবেক ইজারাদার ডা. নাহারুল আলমের দেওয়া তথ্যমতে, এই হাটে কাগজপত্রমূলে সরকারি জায়গা আছে ৬১ শতক। দিনের পর দিন এই হাটের জায়গা বেদখল হয়ে এখন মাত্র ৩০-৩৫ শতক জমিতে ঠেকেছে। কয়েকজন ব্যক্তি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে হাটেই বাসাবাড়ি বা দোকানপাট নির্মাণ করেছেন।
একই অবস্থা উপজেলার বালুয়াহাট, পাকুল্লা হাটেরও। পাকুল্লা এলাকার বিএনপি নেতা জিএম আলী হাসান নারুন জানালেন, পাকুল্লা হাটে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ৪৩ শতাংশ, পাকুল্লা সমবায় সমিতির ১৮ শতাংশ ও সরকারি খাস সম্পত্তি ১৩ শতাংশ। তবে গত কয়েক বছরে হাটের বেশির ভাগ জায়গা দখলে চলে গেছে। 

পাকুল্লা হাটের দেড় শতাংশ জমিতে দুটি দোকান তৈরি করে ভাড়া দিয়েছেন জনৈক আব্দুল হান্নান। বালুয়া হাটের তিন শতাংশ জমিতে দুটি দোকান ও টিনশেডের বাড়ি করেছেন মঞ্জুরুল ইসলাম। এই দুই ব্যক্তির ভাষ্য, সরকার চাইলে জমি ছেড়ে দেবেন। 
সোনাতলার ইউএনও স্বীকৃতি প্রামাণিকের ভাষ্য, হাটের জায়গা দখলের বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো লিখিত আসেনি। পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুপচাঁচিয়া উপজেলার ধাপেরহাটের চার ভাগের এক ভাগই বেদখল হয়ে আছে। এ হাটের তিন শতাংশের মতো জমিতে দোকান করেছেন রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আধাপাকা দোকানঘর তৈরি করে অল্প টাকায় ভাড়া দিয়েছি। দোকানগুলোর নিয়মিত খাজনা দিয়ে থাকি।’ 

একই অবস্থায় পড়েছে জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলার রনবাঘা হাট ও ওমরপুর হাট। দুটি হাটের বেশ কিছু জায়গা দখলদারদের কব্জায়। রনবাঘা হাটের অন্তত ৫ শতাংশ জমি দখল করে হোটেল পরিচালনা করছেন জিয়াউর রহমান। একই হাটের জলি ডেকোরেটরের মালিক আব্দুল জলিলের দখলে আছে ৩ শতাংশ জমি। ওমরপুর হাটের প্রায় ৬ শতাংশ জায়গা দখল করে বাড়ি তৈরি করে বসবাস করছেন আব্দুল আজিজ। এক শতাংশ জমিতে দুটি দোকান করেছেন গোলাম রহমান। এ ছাড়া দেড় শতাংশ দখলে নিয়ে অস্থায়ীভাবে দুটি দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন খোরশেদ আলী। 

মহাস্থান হাটে নতুন স্থাপনা
জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থান হাটটি জেলার অন্যতম বৃহৎ। প্রায় ৫ একর সরকারি জমিতে গড়ে তোলা ঐতিহ্যবাহী এ হাটেও এখন দখলদারের থাবা। সরকার এখান থেকে বছরে প্রায় ১২ কোটি টাকা রাজস্ব পায়। চলতি বছর হাটটি ১১ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় ইজারা পান স্থানীয় জাতীয় পার্টির সমর্থক আশরাফুল ইসলাম শাহাদৎ। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর সঙ্গে যোগসাজশ করে হাট পরিচালনা করেন রায়নগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফি। তিনি আগে জাতীয় পার্টি সমর্থন করতেন। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। 
চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম নবনির্মিত গ্রোয়ার্স মার্কেটের পাশে প্রায় ২ কোটি টাকা দামের ৪ শতাংশ জমি দখলে নিয়েছেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি সেখানে ১০টি পাকা দোকানঘর নির্মাণ শুরু করেন। এসব দোকান নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার আগেই ১০ লাখ টাকা করে নিয়ে আগাম বিক্রি করছেন। দোকানের ক্রেতাদের মধ্যে শহীদুল ইসলাম, আব্দুল জলিল, রানা, মিথুন ও আইনুর ইসলামের নাম জানা গেছে। এ বিষয়ে এসব ক্রেতার কেউ মন্তব্য করতে চাননি। 

জানা গেছে, এই হাটে আগে থেকেই ৩০-৩৫টি অবৈধ দোকান ছিলো। গত মঙ্গলবার সরেজমিনে সেখানে নতুন করে পাকা স্থাপনা নির্মাণের সত্যতা পাওয়া যায়। এ বিষয়ে চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম দাবি করেন, সরকারের অনুমোদন নিয়েই দোকানঘর নির্মাণ করা হচ্ছে।
ইজারদার আশরাফুল ইসলাম শাহাদৎ বলেন, ‘হাটের জায়গায় দোকানঘর নির্মাণের বিষয়টি আমি শুনেছি। ওই জায়গায় দোকানঘর করার অনুমতি দেওয়া আছে বলে জানি।’
শিবগঞ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমান এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, ‘এ বিষয়টি জানার পর দেকানঘর নির্মাণ কাজ বন্ধ করতে বলেছি। পরে কাগজপত্র দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলার হাটবাজারের দায়িত্বে আছেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রাজিয়া সুলতানা। তিনি সমকালকে বলেন, মহাস্থান হাটসহ যেসব হাটের জায়গা দখল করা হয়েছে, সেসব জায়গা উদ্ধারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেবেন। যদিও তিনি এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি।

আরও পড়ুন

×