ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জঙ্গল সলিমপুর

রাস্তা কেটে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা, গোলাগুলি

সাঁড়াশি অভিযানে সন্দেহভাজন ৪৫ জন আটক

রাস্তা কেটে যৌথ বাহিনীর  ক্যাম্পে হামলা, গোলাগুলি
×

 চট্টগ্রাম ব্যুরো ও সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ০৯:৩৫ | আপডেট: ২৬ মে ২০২৬ | ০৯:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে গত রোববার গভীর রাতে ব্যাপক হামলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, সন্ত্রাসীরা যৌথ বাহিনীর একটি ক্যাম্প (চৌকি) লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এরপর ক্যাম্পের দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ভাঙচুর করে তারা। তার আগে অন্তত চার জায়গায় এক্সক্যাভেটর (খননযন্ত্র) দিয়ে রাস্তা কেটে দেওয়া হয়, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করতে না পারে। 

র‍্যাব জানিয়েছে, রাস্তা কেটে দেওয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ভোর ৪টার দিকে ঘটনাস্থলে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযানে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়েছে। র‍্যাব বলছে, এ হামলার সঙ্গে সন্ত্রাসী ‘ইয়াছিন বাহিনী’র সদস্যরা জড়িত।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, রাত ১টার দিকে উঁচু দুই পাহাড়ের দুই দিক থেকে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর স্কুলে যৌথ বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প লক্ষ্য করে প্রথমে গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীদের একটি দল। তার আগে ক্যাম্পটির দুই পাশের পাহাড়ে টিনের ঘর বানায় সন্ত্রাসীরা। সেই ঘর থেকে গুলি ছোড়া হয়। একটি দল গুলি ছুড়ে যৌথ বাহিনীকে ব্যস্ত রাখে। 

তখন আরেকটি দল পেলোডার দিয়ে ক্যাম্পের জন্য নির্মিত নতুন অবকাঠামো ভেঙে দেয়। টিনের চালাও ভেঙে ফেলা হয়। সন্ত্রাসীদের সবচেয়ে বড় কৌশল ছিল দ্রুততম সময়ে যৌথ বাহিনীকে আলীনগর পৌঁছতে না দেওয়া। সে অনুযায়ী বায়েজিদ লিংক রোড-আলীনগর সড়কের চারটি জায়গায় এক্সক্যাভেটর দিয়ে বড় গর্ত করা হয়। ফলে যৌথ বাহিনী গাড়ি নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের দুই কিলোমিটার ভেতরে যেতে পারলেও দ্রুত আলীনগর পর্যন্ত যেতে পারেনি। যৌথ বাহিনীকে প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার পথ হেঁটে ঘটনাস্থলে যেতে হয়েছে। 

র‍্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে ২০০ থেকে ৩০০ সন্ত্রাসী হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা এলএমজি, একে-৪৭, রাইফেল ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে গুলি করেছে। যৌথ বাহিনীও পাল্টা গুলি করে আত্মরক্ষার্থে প্রতিরোধ করেছে। আমরা ঘটনাস্থল থেকে ৪০-৪৫ জন সন্দেহভাজনকে আটক করেছি। যাচাই-বাছাই শেষে অপরাধে সম্পৃক্তদের গ্রেপ্তার দেখানো হবে। নিরীহ ব্যক্তিদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে হাফিজুর রহমান বলেন, ‘সন্ত্রাসী ইয়াছিন বাহিনী এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ঘন ঘন জায়গা বদল করায় আমরা তাকে গ্রেপ্তার করতে পারছি না।’

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্য ছিল। এটা হাতছাড়া হওয়ায় সন্ত্রাসীরা একটু ঝাঁকুনি দেবে, নড়াচড়া করবে এটা স্বাভাবিক। পুলিশের এখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া পিছু হটার সুযোগ নেই। ইয়াছিন বা রোকন যারাই জড়িত থাকুক সবাইকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। সন্ত্রাসীরা গুলি করার পর আত্মরক্ষার্থে প্রতিরোধ হিসেবে ১০৪ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে। পুলিশের কেউ আহত হয়নি।’

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ লিংক রোড থেকে পাহাড়ি পথ ধরে জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় যেতে হয়। এখানে তিন দশক ধরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর খাসজমি ইয়াছিন ও তার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ইয়াছিনের লোকদের অনুমতি ছাড়া এখানে কেউ ঢুকতে পারত না। এখানে রাস্তা, স্কুল, ক্লিনিক সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করত ইয়াছিন। গত ৯ মার্চ যৌথ অভিযানে ইয়াছিন ও তার বাহিনী পালিয়ে যায়। তবে পুরোনো নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে ইয়াছিন ও তার বাহিনী। 

সরেজমিন জঙ্গল সলিমপুর দিয়ে ঢুকে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে দুই কিলোমিটার সামনে এগোতেই একটি কালভার্টের পাশের জায়গায় সড়ক কাটা পাওয়া যায়। কালভার্টের পাশে এমনভাবে কাটা হয়েছে যে, রাতে হওয়া বৃষ্টির পানি অপসারণের পরও কিছুটা জমে আছে। এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকশ গাড়ি সড়কে রাখা। সেখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার যাওয়ার পর সড়কে আরেকটা বড় গর্ত পাওয়া যায়। এভাবে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দূরত্বের পথে পরপর চার জায়গায় সড়কে গর্ত পাওয়া যায়। 

আলীনগরে নতুন টিনশেড ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, দেয়াল ভাঙা। টিনের চালা দুমড়েমুচড়ে গেছে। আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন করে নতুন ক্যাম্পটি উদ্বোধন করার কথা ছিল। 

নির্মাণাধীন ক্যাম্পের রাজমিস্ত্রি রাজীব বলেন, ‘সারাদিন কাজ করে রোববার রাত ১টার দিকে নির্মাণ শেডে ঘুমাতে যাই। চোখে একটু একটু ঘুম এসেছে। এ সময় হঠাৎ একের পর এক গুলির শব্দ শুনে বের হয়ে দেখি, ক্যাম্পের পুলিশ সদস্যরা আলীনগর স্কুলের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। স্কুল থেকেও পুলিশ গুলি করছে। এমন সময় পূর্ব দিক থেকে একটি ট্রাক ও সেটির পেছনে কয়েকশ লোক অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে এসে ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। পরে এক্সক্যাভেটর এনে ক্যাম্প তছনছ করা হয়। ভয়ে আমরা কয়েকজন নালায় আশ্রয় নিই।’

আলীনগর বাজারের মা স্টোরের স্বত্বাধিকারী রফিক উদ্দিন বলেন, ‘রাতে গোলাগুলির আওয়াজে ভয়ে ঘুমাতে পারিনি। আমার দোকান থেকে ক্যাম্পের দূরত্ব আধা কিলোমিটারের কম। আমি দোকানের পেছনেই থাকি। কোন সময় গুলি এসে লাগে সেই আতঙ্কে ছিলাম।’

আলীনগর ঝর্ণা পাড়ার বাসিন্দা রাজিয়া বেগম বলেন, ‘এখানে ১৩ বছর ধরে বসবাস করছি। কয়েক মাস ধরে যা শুরু হয়েছে তাতে স্বামী-সন্তান নিয়ে ভয়েই আছি। এক দিকে ইয়াছিন বাহিনী, অন্য দিকে পুলিশ। কয়েক দিন পরপরই ঝামেলা হচ্ছে। আমরা চাই, এখানে শান্তি ফিরে আসুক।’ 

সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত যানবাহন ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে দুটি এক্সক্যাভেটর, একটি পেলোডার, চারটি ডাম্পট্রাক, একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও দুটি মোটরসাইকেল।

গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় র‍্যাবের ডিএডি মোতালেব হোসেন খুন হয়েছিলেন। 

গত ৯ মার্চ ভোরে সীতাকুণ্ড মডেল থানাধীন জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় তৎকালীন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও বর্তমানে র‍্যাবের মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমন ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে তিনটি হেলিকপ্টার নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সে অভিযানে অংশ নেন সেনাবাহিনীর ৪৮৭ জন, জেলা পুলিশের ১৪৬ জন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ৮০০ জনসহ মোট তিন হাজার ১৮৩ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। তখন ইয়াছিন ও তার দলবল এলাকা থেকে পালিয়ে যায়। অভিযান শেষে সলিমপুর ও আলীনগরে দুটি অস্থায়ী পুলিশ ও র‍্যাবের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। একটি সলিমপুরের প্রবেশমুখে এবং অন্যটি আলীনগর এলাকায়। আলীনগর স্কুলে বর্তমানে যৌথ বাহিনীর সদস্য অবস্থান করছেন। তার পাশেই নতুন ক্যাম্প তৈরি করা হচ্ছিল। নতুন ক্যাম্পের ভবনসহ অবকাঠামোগত প্রায় ৯০ ভাগ কাজই শেষ হয়। বাকি ১০ ভাগ কাজ শেষের পথে ছিল। 
 

আরও পড়ুন

×