চরাঞ্চলে কমছে মহিষ, দুধ-দই শিল্প হুমকিতে
জাহিদুর রহমান, সুবর্ণচর (নোয়াখালী) থেকে
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ১১:২৭
মেঘনার বুকে জেগে ওঠা সুবর্ণচরের বিস্তীর্ণ সবুজ চর। সেই সবুজের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চরে বেড়াচ্ছে শত শত মহিষ। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের মাঝে গড়ে ওঠে উপকূলের এক অনন্য অর্থনীতি– মহিষের দুধ, দই এবং চারণভূমিনির্ভর প্রাণিসম্পদ খাত। কিন্তু বিশ্ব দুগ্ধ দিবসের প্রাক্কালে মহিষ পালন ও দুধ-দইয়ের অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কার কথা জানালেন উপকূলীয় চরাঞ্চলের খামারিরা।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ১ জুন পালিত হচ্ছে বিশ্ব দুগ্ধ দিবস। এ উপলক্ষে আজ সোমবার রাজধানীতে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। সকাল ১০টায় ঢাকার ফার্মগেটে অবস্থিত কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (কেআইবি) থ্রিডি সেমিনার হলে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
এদিকে বিশ্ব দুগ্ধ দিবসের প্রাক্কালে নোয়াখালীর উপকূলীয় চরাঞ্চলের খামারিরা জানালেন ভিন্ন চিত্র। তারা বলছেন, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মহিষভিত্তিক যে দুগ্ধ শিল্প গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা জেগেছিল, তাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চারণভূমির সংকট।
নোয়াখালীর সুবর্ণচর, হাতিয়া, কোম্পানীগঞ্জ, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও ফেনীর সোনাগাজীর উপকূলীয় চরগুলো বহু বছর ধরে মহিষ পালনের জন্য পরিচিত। এসব অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ঘাস, লবণাক্ত পরিবেশ এবং বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত চর মহিষের জন্য আদর্শ আবাসস্থল। স্থানীয় ভাষায় এসব চারণভূমি ও পশু রাখার ব্যবস্থাকে বলা হয় বাথান। আর যারা পশু দেখভাল করেন, তারা পরিচিত বাথানি বা রাখাল হিসেবে।
সপ্তাহে কয়েক দিন ছাড়া অনেক চরে নিয়মিত নৌযান চলাচল করে না। ফলে বিচ্ছিন্ন এসব অঞ্চলে গড়ে উঠেছে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা। সেখানে মহিষের পাল দিনের পর দিন খোলা চরে বিচরণ করে প্রাকৃতিক ঘাস খেয়ে দুধ দেয়। মহিষের দুধে চর্বি বেশি বলে তা ঘন, সুস্বাদু হয় এবং দই তৈরির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সুবর্ণচরের বিখ্যাত টক দই স্থানীয় উদ্যোক্তাদের হাত ধরে এখন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে।
স্থানীয় উদ্যোক্তা মাহবুবুর রহমান কয়েক বছর ধরে হাতিয়ার স্বর্ণদ্বীপ ও উড়িরচর থেকে মহিষের দুধ এনে দই তৈরি করছেন। তিনি বলেন, আমাদের তৈরি টক দইয়ের চাহিদা দিন দিন বাড়ছিল। এখন দুধের উৎপাদন কমে যাওয়ায় আগের মতো মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নোয়াখালীর উপকূলীয় চরাঞ্চলে অন্তত ২০০টি চারণভূমিনির্ভর খামার রয়েছে। এসব খামারে রয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার মহিষ, ৫৬ হাজার দেশি গরু এবং ৬৫ হাজার ভেড়া। এসব খামার থেকে উৎপাদিত মাংস, দুধ, দই, পশম ও চামড়া স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। হাজারো পরিবার সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করছে এই খাতের ওপর নির্ভর করে।
সুবর্ণচরের খামারি মিলন বলেন, ১৯৯৮ সাল থেকে হাতিয়ার স্বর্ণদ্বীপ ছিল মহিষ ও গরুর সবচেয়ে বড় বিচরণক্ষেত্র। সেখানে ঘাস ছিল, বন ছিল, প্রাকৃতিক আশ্রয় ছিল। এখন সেখানে কৃষিজমি ও বসতি গড়ে উঠছে। মাটির কিল্লাগুলোও প্রায় বিলীন। প্রয়োজনীয় ঘাস আর পাওয়া যাচ্ছে না বলে পশুগুলো অপুষ্টিতে ভুগছে। একই সঙ্গে বনভূমি কমে যাওয়ায় রোদ ও বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘ সময় থাকতে হচ্ছে পশুগুলোকে। এতে নানা রোগব্যাধি বাড়ছে। খামারিরা বলছেন, চরাঞ্চলের অনেক এলাকায় কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশকও পশুর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নোয়াখালী চরাঞ্চল প্রাণিসম্পদ উৎপাদনমুখী মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মো. সোহাগ চৌধুরী বলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশে বড় হওয়া মহিষ ও গরুর মাংস যেমন সুস্বাদু, তেমনি দুধের গুণগত মানও অনেক ভালো। কিন্তু চারণভূমি কমে যাওয়ায় পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দুধ কমছে, দই কমছে, খামারও কমছে।
নোয়াখালী জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, স্বর্ণদ্বীপের সরকারি জমি উদ্ধারের পাশাপাশি নতুন জেগে ওঠা চরগুলোকে চারণভূমি হিসেবে সংরক্ষণের বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়, বন বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মধ্যে আলোচনা চলছে। স্বর্ণদ্বীপের মতো জায়গাগুলো সংরক্ষণ করা না গেলে উন্মুক্ত মহিষ পালন টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
লক্ষ্মীপুরে সাত কারণে হুমকিতে মহিষ পালন
মেঘনার উপকূলীয় চরাঞ্চল ঘিরে গড়ে ওঠা নোয়াখালীর পাশের জেলা লক্ষ্মীপুরেও মহিষ পালন এখন সংকটে। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ মহিষের দুধের চাহিদা বাড়লেও কমছে মহিষের সংখ্যা ও দুধ উৎপাদন। দুই বছর আগেও জেলায় যেখানে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার মহিষ ছিল, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৫০ হাজারে।
উপকূলীয় চরাঞ্চলে মহিষ পালন দীর্ঘদিন ধরে হাজারো মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস। গত চার থেকে পাঁচ বছরে চরাঞ্চলে মহিষ পালন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এর পেছনে সাতটি কারণ চিহ্নিত করেছেন স্থানীয় খামারিরা। এগুলো হলো– চরে মানুষের বসতি বৃদ্ধি, কৃষিজমির সম্প্রসারণ, ঘাস ও পশুখাদ্যের সংকট, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ না পাওয়া, আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাব, নদীপথে চুরি-ডাকাতি এবং ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষায় পর্যাপ্ত মাটির কিল্লা না থাকা। এ অবস্থায় প্রাণিসম্পদ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রান্তিক খামারিরা।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরের উপকূলীয় চরাঞ্চল মহিষ পালনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। জেলার নদীবেষ্টিত ১২টি দ্বীপচর এবং মূল ভূখণ্ড মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার মহিষের তথ্য সরকারি হিসাবে রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় পাঁচ হাজার ৭০০, রামগতিতে ছয় হাজার ৩০০, কমলনগরে ছয় হাজার এবং রায়পুরে এক হাজার ২০০ মহিষ রয়েছে।
যদিও প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হবে বলে মনে করছেন খামারি ও বাথান মালিকরা। জেলার বিভিন্ন দুর্গম চরাঞ্চলে ব্যক্তি উদ্যোগে বিপুলসংখ্যক মহিষ পালন করা
হলেও সেগুলোর অনেকই সরকারি জরিপের আওতায় আসেনি। বেসরকারি সূত্র এবং অন্তত ১৫ জন বাথান মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে লক্ষ্মীপুরে প্রায় ৫০ হাজার মহিষ রয়েছে। দুই বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল ৬৫ থেকে ৭০ হাজারের মধ্যে।
সমাজ উন্নয়নকর্মী মতিউর রহমান বলেন, সরকার একটু নজর দিলেই চরাঞ্চলে মহিষ পালনে বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এতে বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে দেশের মাংস ও দুধের চাহিদা পূরণেও বড় ভূমিকা রাখবে। কিন্তু যেভাবে মহিষ পালন কমে যাচ্ছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না, যা উদ্বেগজনক।
খামারিদের মতে, উপকূলীয় চরাঞ্চলকে মহিষের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের একটি বড় বাজার হিসাবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা।
