ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট
ব্যয় বেড়েছে ১৮ হাজার কোটি টাকা, তবু শেষ হয়নি প্রকল্প
তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৫ | আপডেট: ০২ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৬
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জের ধরে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় দেশে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হচ্ছে। বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে তেল সংগ্রহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। তবে এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট হতে পারত জ্বালানি নিরাপত্তা ও সাশ্রয়ে তেলের বড় একটি উৎস। কিন্তু বছরের পর বছর অবহেলা ও গাফিলতির কারণে এটি নির্মাণ করা যায়নি। সর্বশেষ সরকারি অর্থায়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেও এখন ব্যয়ের বড় একটি অংশ বিদেশি ঋণ সহায়তা চাইছে সরকার। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নতুন করে বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির যে ইউনিটটি রয়েছে, সেটিতে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রুড (অপরিশোধিত তেল) ছাড়া অন্য কোনো দেশের ক্রুড পরিশোধন করা যায় না। কিন্তু এটির দ্বিতীয় যে ইউনিট নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে, সেটিতে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও রাশিয়া, ভেনেজুয়েলাসহ বিভিন্ন দেশের হেভি ক্রুডও পরিশোধন করা যাবে। তাতে ক্রুড আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
২০১৩ থেকে ২০২৫ সাল– ১২ বছরের ব্যবধান। এই সময়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইআরএলে দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে ব্যয় বেড়েছে ১৮ হাজার কোটি টাকা। শুরুতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রয়োজন ছিল ১৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরে এসে এ ব্যয় গিয়ে ঠেকেছে ৩১ হাজার কোটি টাকায়।

তথ্যমতে, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা দেওয়ার কথা সরকারের। আর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে দেওয়ার কথা ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। এ হিসাবে ব্যয়ের ৬০ শতাংশ সরকার এবং ৪০ শতাংশ বিপিসির জোগান দেওয়ার কথা ছিল। তবে এখন বিদেশি ঋণে এই তেল পরিশোধনাগার প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহী সরকার। এ জন্য বিএনপি সরকার ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) ঋণ সহায়তা চেয়েছে। প্রাথমিকভাবে আইডিবির কাছে ১০০ কোটি ডলার ঋণ চাওয়া হয়েছে।
অবশ্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীনের এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক-এআইআইবি আগ্রহ দেখাচ্ছে। কোনো কারণে আইডিবির সঙ্গে বনিবনা না হলে এআইআইবির সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
তবে গত ১৭ এপ্রিল পরিদর্শনকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছিলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারির নতুন ইউনিট নির্মাণ শেষে ২০২৯ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটা হলে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আরও অনেক দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক সংকটের ঝুঁকি হ্রাস পাবে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানান, প্রকল্পটির মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু করতে ডিসেম্বরের মধ্যে কনসালট্যান্ট নিয়োগের কাজ সম্পন্ন করা হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতেই প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে।
পতেঙ্গায় অবস্থিত আওতাধীন ইআরএলের বর্তমান ইউনিটে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা যায়। এটির দ্বিতীয় ইউনিটটি হবে দ্বিগুণ সক্ষমতাসম্পন্ন।
বিপিসির তথ্য বলছে, রিফাইনারিটির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ করা গেলে বছরে ২৫ থেকে ৩০ কোটি ডলার সাশ্রয় হবে। গত ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একনেকের সভায় প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ গত ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়।
ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল-২’ এর প্রকল্প পরিচালক শরীফ হাসনাত সমকালকে বলেন, ইআরএল-২ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট (পিএমসি) নিয়োগে গত ২৫ মে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। ছয় সপ্তাহের মধ্যে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিস্তারিত প্রস্তাব চাওয়া হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে কনসালট্যান্ট নিয়োগের পর পরবর্তী ধাপের কার্যক্রম শুরু করা হবে। তবে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারায় ডলারের দাম বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে।
- বিষয় :
- ইস্টার্ন রিফাইনারি
