একপাশে চলছে পার রক্ষার কাজ অন্যপাশে মাটি কেটে সাবাড়
ফটিকছড়ির পাঁচপুকুরিয়া এলাকায় একদিকে হালদার তীর রক্ষার কাজ চলছে। এর বিপরীত দিকেই চলছে মাটি কাটা সমকাল
ইকবাল হোসেন মনজু, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী। এটির একপাশে কোটি টাকা ব্যয়ে চলছে পার রক্ষায় জিও ব্যাগ ফেলার কাজ আর অন্যপাশে রাতের আঁধারে নদীর পার কেটে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের পাঁচপুকুরিয়া এলাকায় একটি প্রভাবশালী মাটিখেকো চক্র নদীর পার কেটে সাবাড় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সুয়াবিল ইউনিয়ন অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলার মধ্যেই বিপরীত দিকে হালদা নদীর পূর্ব অংশ থেকে অবাধে কাটা হচ্ছে নদীর পার ও নদীরক্ষা বাঁধ। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় সরওয়ার কামাল, মো. আকবর ও কুদ্দুসসহ কয়েকজনের একটি প্রভাবশালী চক্র এক্সক্যাভেটর দিয়ে মাটি পিকআপ ভ্যানে তুলে বিভিন্ন এলাকায় ভরাটের কাজে সরবরাহ করছে।
সরেজমিন দেখা যায়, হালদা নদীর ওপর পাঁচপুকুরিয়া-সিদ্ধাশ্রম নির্মাণাধীন সেতুর উত্তর পাশে সুয়াবিল অংশে শত শত জিও ব্যাগ ফেলে পার রক্ষার কাজ চলছে। ঠিক বিপরীত পাশে সুন্দরপুর অংশে ৫ থেকে ১০ ফুট গভীর গর্ত করে নদীর পার কেটে সাবাড় করা হয়েছে। এ ছাড়া আশপাশের আরও কয়েকটি পয়েন্ট থেকেও একইভাবে মাটি কাটা হয়েছে। এসব মাটি টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন ভিটা, পুকুর ও জমি ভরাটে ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে ওই এলাকার প্রবাসী ইব্রাহিমের ভিটায় গিয়ে দেখা যায়, হালদার পার কেটে আনা বালুমিশ্রিত মাটি। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রথমে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন ইব্রাহিম। পরে তিনি বলেন, এগুলো আমার জায়গা নয়, আমার ভাইয়ের ভিটা ভরাটের জন্য আনা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হালদা পারের এক পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তি বলেন, তিন-চার দিন ধরে রাত ১২টার দিকে লোকজন মাটি কেটে গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা শঙ্কায় আছি। বেশি বৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢলে আবারও পার ভেঙে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখানো হয়। নিরাপত্তার কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সরওয়ার কামাল, মো. আকবর ও কুদ্দুসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা সবাই মাটি কাটার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাদের দাবি, এসব কারা করছে তা তারা জানেন না।
চট্টগ্রামে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক সিফাতুল্লাহ সিফাত বলেন, পার কেটে নেওয়া মানে নদীর স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তন করে ফেলা। এতে শুধু জলজ প্রাণী নয়, পুরো পরিবেশেরই ক্ষতি হবে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। ভবিষ্যতে বন্যাসহ নানা দুর্যোগে মানুষ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে, যার ভোগান্তি দীর্ঘদিন থাকবে। দেশে যেহেতু এ বিষয়ে আইন রয়েছে, তাই প্রশাসনকে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এসব ঘটনায় মামলা করতে হবে, তাহলেই আসামিরা শনাক্ত হবে।
হালদা নদী গবেষক ও বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, পার কাটা নদী ও নদীর পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি আইনগতভাবেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। হালদা নদীতে ২০১৭ সালে সব বালুমহালের ইজারা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এটিকে হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাই কোনোভাবেই নদী থেকে বালু উত্তোলন ও পার কাটা যাবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাজ হচ্ছে এসব দমন করা এবং দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা। পাশাপাশি প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয়দেরও সাহসী প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে।
চট্টগ্রাম পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সোহাগ তালুকদার বলেন, যত্রতত্র পার কাটলে নদীভাঙন, গতিপথ পরিবর্তনসহ নানা ঝুঁকি তৈরি হয়। সরকার যেখানে নদীভাঙন রোধে কোটি কোটি টাকার কাজ করছে, সেখানে নদীর পার কাটলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
ফটিকছড়ির ইউএনও সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, বিষয়টি জানাম না। এখন জানতে পেরেছি। মাটি কাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর চেষ্টা করব।
- বিষয় :
- মাটিকাটা
