ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

কচা নদীর স্রোতে ভাঙছে হাজার কোটির বেড়িবাঁধ

কচা নদীর স্রোতে ভাঙছে হাজার কোটির বেড়িবাঁধ
×

কচা নদীর স্রোতে ভেঙে গেছে বেড়িবাঁধের এই অংশটি। সম্প্রতি পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নের জুনিয়া গ্রাম থেকে তোলা সমকাল

বরিশাল ব্যুরো ও ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) সংবাদদাতা

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় কচা নদীর তীব্র স্রোতে ভাঙন দেখা দিয়েছে বেড়িবাঁধে। মাসখানেক আগে তেলিখালী ইউনিয়নের জুনিয়া গ্রামে এই ভাঙন শুরু হয়। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ মিটার বাঁধ কচা নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনকবলিত অংশে মাটি ফেলে কোনোভাবে পানির চাপ আটকে রাখা হয়েছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, যে কোনো সময়ে জোয়ারে লবণাক্ত পানি ঢুকে শত শত একর ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাবে। পাশাপাশি তারা বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন। তারা বলছেন, সাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হলে জলোচ্ছ্বাসে প্রাণহানিও ঘটতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, উপকূলীয় এলাকার জনগণকে জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা এবং লবণাক্ত পানির প্রবেশ রোধ করে কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে কচা নদীর তীরে বেড়িবাঁধ তৈরির প্রকল্পটি নেওয়া হয়। চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চংকিং ইন্টারন্যাশনাল কনস্ট্রাকশন করপোরেশন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। ভাণ্ডারিয়া উপজেলা থেকে বরগুনার পাথরঘাটা পর্যন্ত বেড়িবাঁধের দৈর্ঘ্য ৪৯ কিলোমিটার। প্রকল্পের মধ্যে ১২টি স্লুইসগেটও ছিল। ২০২৩ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। 
প্রকল্পের মেয়াদ শেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভাণ্ডারিয়া থেকে প্রকল্প অফিস গুটিয়ে নেয়।

জুনিয়া গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুরু থেকেই প্রকল্পের কাজে সঠিক তদারকি ছিল না। বিশেষ করে স্লুইসগেটের কাছে নদীর পাইলিং সঠিকভাবে নির্মাণ করা হয়নি। এমনকি, জুনিয়া গ্রাম এলাকায়

পর্যাপ্ত পরিমাণে জিও ব্যাগ বা সিসি 
ব্লক ফেলেননি ঠিকাদারের লোকজন। এ কারণে সম্প্রতি এই গ্রামের পাশে কচা নদীর তীরে ভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে।
গ্রামবাসীর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরে বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হানে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর। এতে দেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রাণ হারান তিন হাজারের বেশি মানুষ। এদের মধ্যে ১১৯ জন ছিলেন ভাণ্ডারিয়া উপজেলার। সিডরে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে এই উপজেলার জুনিয়া গ্রামেই মারা যান ১০৪ জন। কচা নদীর তীরে বেড়িবাঁধ নির্মাণের কারণে গ্রামবাসীর মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ছিল। বাঁধ নির্মাণের বছর তিনেকের মধ্যে ভাঙন দেখা দেওয়ায় নতুন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে তাদের মনে।

জুনিয়া গ্রামের কৃষক রিয়াদুল ইসলাম গত বৃহস্পতিবার ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অথচ শত শত ব্লক নদীর সঠিক জায়গায় স্থাপন করা হয়নি। নদীর পারেই ফেলে রাখা হয়েছে।
জাহাঙ্গীরের অভিযোগ, কাজের সময় কোনো তদারকি ছিল না। যে কারণে বাঁধের কাজটা একেবারেই টেকসই হয়নি। এখন নদীভাঙনে তারা নিঃস্ব হওয়ার পথে।
একই গ্রামের কৃষক মো. শাহাবুদ্দিন তালুকদার বলেন, পানির প্রবল স্রোতে বাঁধের একটি অংশ ইতোমধ্যে কচা নদীতে তলিয়ে গেছে। বড় জলোচ্ছ্বাস বা ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়বে। এতে বিঘ্নিত হবে এলাকাবাসীর কৃষিকাজ। জুনিয়া গ্রামের মানুষ ভিটেজমি হারানোর আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
এলাকাবাসী বলছেন, ভাঙনকবলিত অংশে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও ব্লক ফেলা প্রয়োজন। এখানে ভাঙন ঠেকানো না গেলে সরকারের হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি পুরোপুরি ভেস্তে যাবে।
পাউবো পিরোজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী নুসাইর হোসেন গতকাল শনিবার সমকালকে বলেন, জুনিয়া গ্রামে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি তারা জানেন। ওই বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প দুই বছর আগে শেষ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কারে পাউবোর ঊর্ধ্বতন দপ্তরে টাকা বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দেবেন। বরাদ্দ পেলেই সংস্কারের আশ্বাস দেন তিনি। 
 

আরও পড়ুন

×