কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম
‘আমরার নাম লিস্টিত দিছে না’
বিজয় কর রতন, মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ১০:৪০
ঋণের টাকায় বর্গা নেওয়া বরধলী হাওরের পাঁচ একর জমিতে চলতি মৌসুমে ধান চাষ করেছিলেন আহিম উদ্দিন। ১ শতাংশ জমির ধানও কাটতে পারেননি, এরই মধ্যে ঢলে তলিয়ে যায় তাঁর জমি। পানির নিচ থেকে সামান্য ধান সংগ্রহ করতে পারেন কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার এই কৃষক।
তবে শুকানোর জায়গা না পাওয়ায় সেই ধানও নষ্ট হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সরকারি তালিকায় নাম ওঠানোর জন্য এনআইডির ফটোকপি দিয়েছিলেন আহিম উদ্দিন (৬০)। কিন্তু ভাতশালা গ্রামের এই বাসিন্দার নাম ওঠেনি উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত ৬ হাজার ৪ জন কৃষকের তালিকায়।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বর্গাচাষি আহিম উদ্দিন। তিনি পরিবারের পুরো বছরের ভরণপোষণ ও ঋণশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তাঁর অভিযোগ, সরকারি সহায়তা এমন অনেকে পেয়েছেন, যাদের জমি নেই, চাষও করেননি।
উপজেলার আটটি ইউনিয়নে অকাল বন্যায় হাজার হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের সহায়তার জন্য যে তালিকা তৈরি করা হয়েছে, এতে নাম পাওয়া গেছে দুই বছর আগে মারা যাওয়া ব্যক্তিরও। এমনকি জমি নেই, কৃষক নন, প্রবাসে আছেন– এমন ব্যক্তির নামও উঠেছে তালিকায়। অথচ ধান চাষ করে ঘরে তুলতে পারেননি এমন অনেক কৃষকের নাম বাদ পড়েছে।
গত শনিবার সকালে কলমা ইউনিয়নের সাপান্তর গ্রামে গিয়ে কথা হয় কৃষক জওহরলাল দাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘৫০ ক্ষের (চার ক্ষেরে এক একর) জমি করছিলাম। পানির তলে গেছেগা, কাইট্টা আনতাম পারছি না। কেমনে চলুম, কি খাইমু হেই চিন্তায় জান বাঁচে না। হুনছি সরকারে পানির তলের জমি লিস্টি (তালিকা) করছে, আমরার নাম লিস্টিত দিছে না।’
একই গ্রামের পরিমল দাস চার একর, পরমেশ্বর দাস আড়াই একর জমিতে ধান চাষ করেন। ক্ষতির ভয়াবহতা উঠে আসে পরিমলের কথায়। তিনি বলেন, ‘সব পানির তলে, ডেডা (ধানগাছ) পর্যন্ত আনতাম পারছি না। আমরার নাম দিবো? নেতারার এই প্যাড (পেট) ভরে না।’
এই চাষির কথায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাই পছন্দের লোকদের নাম তালিকায় দিয়েছেন। তাদের কয়েকজনের পিছু ঘুরতে হয়েছে বলে জানান কৃষকরা। পরমেশ্বর দাস যেমন বলছিলেন, ‘১০ ক্ষের (আড়াই একর) ক্ষেত করছিলাম। সবই পানিয়ে লইয়া গেছে। সাহায্যের নামের লাগি কয়েকদিন ঘুরছি। নেতারা নাম দেয় না।’
কাকুরিয়া গ্ৰামের বয়োবৃদ্ধ অনিল দাস সাড়ে সাত এক একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। তাঁর সব ধানই গেছে পানির তলায়। তিনি বললেন, ‘খুব কষ্ট কইরা চলতাছি। হাওরে এই পানির মধ্যে মাছও ধরতাম পারি না। মাঝেমধ্যে পানির তল থেইক্কা পচা ধান তুইল্লা আনি প্যাডের জ্বালায়। আমরার নাম লিষ্টিত নাই, আমরারে কেউ জিগায় না।’
কাস্তুল ইউনিয়নের ভাতশালা গ্ৰামের কৃষক সমরু উদ্দিন বরধলী হাওরে তিন একর জমি চাষ করেছিলেন। এক একর জমির ধান কাটতে পারলেও তাঁর বাকি জমি তলিয়েছে। সমরু উদ্দিন বললেন, ‘সরকার সাহায্যের তালিকা হইছে হুনছি। আমরার কাডের ফটোকপি নিছে নেতারা। অহন দেহি লিষ্টিত নাম নাই।’ অপর কৃষক উবায়দুল্লাহ বলেন, ‘সাত একর জমি করছিলাম। দুই একর কাটছি।
বাকি জমির ধান আর বাড়িত আনতাম পারছি না। এর আগেওই পানির তলে গেছে গা। হুনছি সরকার সাহায্য দিবো। ৩ হাজার টেহা ও ১৫ কেজি চাল। এই সাহায্যে আমরার কিছতা হইতো না। এরপরেও আইডি কার্ড দিছি তালিকাত নাম তুলবার লাগি। নামও নাই, সাহায্যও নাই। আমরা ভাতলা (ভাতশালা) গেরামের কয়েকজন টেহা পাইছে, চাল পাইছে। হেরারে কোনোদিন দেখছি না ক্ষেত করতে। আমরা পরতিবাদ করলে জান বাঁচতো না। পাইছি না, এইডাই বালা।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সহায়তার তালিকায় থাকা ইসহাক মিয়া মারা গেছেন দুই বছর আগে। তিনি বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নের উসমানপুর গ্রামের মৃত হোসেন আলীর ছেলে। এ ছাড়া তালিকায় নাম আছে প্রবাসী দুজনের। তারা হলেন অলি মিয়া ও সোহেল আহমেদ। দেওঘর ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামের ইসাম উদ্দিনের ছেলে অলি মিয়া থাকেন সৌদি আরব। দেওঘর গ্রামের ধন মিয়ার ছেলে সোহেল ইতালিপ্রবাসী। কৃষকদের অভিযোগ, এমন বহু মানুষের নাম তালিকায় রয়েছে, যারা কৃষক নন।
অষ্টগ্রামের পিআইও মো. মজনু মিয়া বলেন, মৃত ব্যক্তি ও প্রবাসীদের নাম তালিকায় থাকলেও তারা সহায়তা পাবেন না। যাচাই-বাছাই করেই নামের বিপরীতে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে। তালিকাটি কৃষি অফিসের মাঠকর্মী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা করেছেন। এরপরও টাকা দেওয়ার আগে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করার আশ্বাস দেন তিনি।
বক্তব্য জানতে অষ্টগ্রামের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিলভিয়া স্নিগ্ধার নম্বরে কল দিলেও ধরেননি তিনি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ পণ্ডিত বলেন, আটটি ইউনিয়নে ৬ হাজার ৪ জন কৃষকের নামের তালিকা অনুমোদন হয়েছে। কেউ বাদ পড়লে এখন করার কিছু নেই। সরকার যদি দ্বিতীয় পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করার নির্দেশ দেন, তখন বাদ পড়া কৃষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তাঁর ভাষ্য, তালিকার অধিকাংশ নাম রাজনৈতিক ব্যক্তিরা দিয়েছেন। তবে প্রবাসী, মৃত ব্যক্তি ও একই পরিবারের একাধিক নাম তালিকায় থাকলে টাকা-চাল দেওয়ার আগে যাচাই-বাছাই করবেন। প্রয়োজনে সেই বরাদ্দ সরকারি কোষাগারে জমা হবে।
- বিষয় :
- কিশোরগঞ্জ
