ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

বাঘ-কুমিরের চেয়েও বড় ভয় দস্যু

বাঘ-কুমিরের চেয়েও বড় ভয় দস্যু
×

সামিউল মনির, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ১০:৪৪

রাত তখন প্রায় ১১টা। সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের মালঞ্চ নদীর ‘বাচা কলাগাছিয়া’ এলাকায় কাঁকড়া শিকার করছিলেন দুই ভাই। হঠাৎ তিনটি নৌকায় এসে হাজির ১১-১২ জন সশস্ত্র দস্যু। নিজেদের ‘নানা ভাই বাহিনী’ পরিচয় দিয়ে তারা একজনকে জিম্মি করার চেষ্টা করে। প্রাণভয়ে অন্য ভাই জানান, বনে ঢোকার আগেই বিকাশে ২০ হাজার টাকা দিয়ে ‘অনুমতি’ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দস্যুদের কাছে নম্বরের সঙ্গে সেই নম্বরের মিল না পাওয়ায় শেষ রক্ষা হয়নি। গভীর রাতে বাড়ি থেকে আরও ২০ হাজার টাকা পাঠানোর পর ভোরে মুক্তি মেলে দুই ভাইয়ের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী দুই ভাই বলেন, ‘টাকা দিয়েও এখন বনে যেতে ভয় লাগে। দস্যুরা কীভাবে সব খবর আগেই পেয়ে যায়, সেটাই বুঝি না।’

গত ১১ মে খুলনার বটিয়াঘাটার মো. হাসান ও তার তিন সহযোগী শরীফ বাহিনীর হাতে জিম্মি হন। দস্যুরা মাথাপিছু ৫০ হাজার টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করে। পরে ২০ মে শরণখোলা রেঞ্জে বন বিভাগের স্মার্ট প্যাট্রল টিমের অভিযানের পর তারা মুক্ত হন।

সুন্দরবনের বনজীবীদের কাছে এমন ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। মাছ, কাঁকড়া, মধু কিংবা গোলপাতা সংগ্রহে বনে ঢুকতে হলেই দিতে হচ্ছে চাঁদা। অনেক ক্ষেত্রে টাকা দিয়েও মিলছে না নিরাপত্তা। অপহরণ, নির্যাতন আর মুক্তিপণের আতঙ্কে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উপকূলের হাজারো পরিবার।

‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণার পর ফের পুরোনো আতঙ্ক

২০১৮ সালে সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন ছোট-বড় প্রায় ৩৫টি বাহিনীর কয়েকশ সদস্য আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু বনজীবীদের দাবি, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কারাগার ভাঙার ঘটনায় খোকা বাবু বাহিনীর প্রধান খোকা বাবুসহ কয়েকজন দস্যু সহযোগী পালিয়ে যায়– এ তথ্য নিশ্চিত করেন সাতক্ষীরা কারাগারের জেলার দুলাল কর্মকার। 

বর্তমানে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে আলিম ওরফে আলিফ বাহিনী, জোনাব বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী ও ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি বনজীবীদের। একইভাবে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জেও কয়েকটি নতুন উপদল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে করিম শরীফ বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর, শরীফ বাহিনী, আছাফুর বাহিনী, গাজী বাহিনী, মুক্তার বাহিনী ও দুলাভাই বাহিনী অন্যতম।

হরিনগর গ্রামের সবুর গাইন বলেন, ‘আগে বাঘ-কুমিরের ভয় ছিল, এখন তার চেয়েও বড় ভয় জলদস্যু।’ বাগেরহাটের শরণখোলার এক মৌয়াল বলেন, ‘এখন মধু কাটার চেয়ে ডাকাতদের চোখ ফাঁকি দেওয়া বেশি কঠিন।’

পশ্চিম বন বিভাগের ডিএফও এজেডএম হাসানুর রহমান জানান, সুন্দরবনের দস্যু দমনের মূল দায়িত্ব এখন কোস্টগার্ডের ওপর রয়েছে। খবর পাওয়া মাত্রই কোস্টগার্ডকে তথ্য দেওয়া ছাড়াও দস্যু দমনে যৌথ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। নতুন কয়েকটি তালিকাভুক্ত বাহিনীর বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। তবে সীমিত জনবল ও অস্ত্র নিয়ে বিস্তীর্ণ জলসীমায় সংঘবদ্ধ দস্যুদের নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

‘ছয় মাসের কার্ড’, দেড় মাসেই নতুন দাবি

শ্যামনগরের দক্ষিণ কদমতলা গ্রামের বনজীবী জবেদ আলীর কণ্ঠে ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব স্পষ্ট। প্রায় তিন দশক ধরে সুন্দরবনে যাতায়াত করা এই বনজীবী বলেন, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দুই সহযোগীসহ বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। বিভিন্ন বাহিনীকে প্রায় ৭০ হাজার টাকা দিয়ে ‘কার্ড’ও সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু দেড় মাস পার হতেই আবার নতুন করে টাকা দাবি করা হচ্ছে। ‘সমিতির ঋণ শোধ করতে পারিনি। আবার ডাকাতরা টাকা চাইছে। এখন না পারছি বনে যেতে, না পারছি সংসার চালাতে’– বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

একই ধরনের অভিজ্ঞতা পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের জেলে-বাওয়ালিদেরও। মোংলার রামপাল থানার ভাগা বাজার এলাকার হাসান জানান, দস্যুদের দেওয়া টোকেন বা কার্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বনের গহিন খালে নতুন কোনো উপদলের মুখে পড়তে হচ্ছে। সেখানে আগের কার্ডের কোনো স্বীকৃতি মিলছে না, দিতে হচ্ছে নতুন করে মোটা অঙ্কের চাঁদা।

স্থানীয় বনজীবীদের দাবি, আগে দস্যুরা বনের ভেতরে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করলেও এখন ‘কার্ড সংস্কৃতি’ চালু করেছে। ৫, ১০ ও ২০ এবং ৫০ টাকার নোটকে ‘কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করে আগেভাগেই টাকা আদায় করা হচ্ছে। পাঁচ টাকার নোটের ভিত্তিতে এক গোন আর ১০ ও ২০ টাকার নোটে এক মৌসুম এবং ৫০ টাকার নোটের মাধ্যমে ফিশিং ট্রলারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট নম্বরের সেই নোট দেখিয়েই বনজীবীদের বনে চলাচল করতে হচ্ছে।

‘প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায়’ দস্যু তৎপরতা

সুন্দরবনের মাছ ধরার লাভজনক এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু প্রভাবশালী নৌকার মালিক, মাছ ব্যবসায়ী, আড়তদার ও মহাজন চক্র জলদস্যুদের পেছন থেকে সহায়তা দেয়। সাধারণ জেলেরা যাতে সব এলাকায় স্বাধীনভাবে মাছ ধরতে না পারে, সেজন্য দস্যুদের মাধ্যমে ভয়ভীতি ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের জেলে আব্দুল হাকিম গাজী বলেন, ‘বড় কোম্পানির সঙ্গে বিরোধ করে বনে টেকা যায় না। তাদের বিরাগভাজন হলে দস্যুদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়।’ তবে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী অয়ন কোম্পানির মালিক মোজাহিদুল ইসলাম অয়ন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, দস্যুদের সঙ্গে কোনো আর্থিক সম্পর্ক নেই, বিপদে পড়া জেলেদের মানবিক সহায়তা করা হয় মাত্র।’

খুলনা রেঞ্জের কয়রা উপজেলার গোবরা এলাকার বনজীবী সফি ও বিল্লাল হোসেন জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের মাছ, কাঁকড়া শিকার ও মধু সংগ্রহে জড়িত। বর্তমানে সুন্দরবনে যেতে হলে মহিদুল ও মিন্টুর মালিকানাধীন ‘খাটো মিন্টু কোম্পানি’ থেকে কার্ড সংগ্রহ করতে হয়। 

কোটি টাকার ‘কার্ড বাণিজ্য’

২০২৫-২৬ অর্থবছরের সরকারি ও স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জ– সাতক্ষীরা, খুলনা, চাঁদপাই ও শরণখোলায় প্রায় ১১ হাজার অনুমোদিত নৌকার বিপরীতে প্রায় ২৬ হাজার বনজীবী ও জেলে লক্ষাধিকবার বনে প্রবেশ করেছেন। তবে এর মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জ ও চাঁদপাই রেঞ্জের চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ। সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে বনজীবীদের কাছ থেকে চলতি মৌসুমে দস্যুরা মোট দুই কোটি ৭৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই রেঞ্জে ১৫০০টি নৌকা থেকে ১০-২৫ হাজার টাকা দরে ‘অগ্রিম কার্ড’ বিক্রি করে এক কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং দুই শতাধিক জেলেকে জিম্মি করে আরও ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ নেওয়া হয়েছে। একইভাবে মধু সংগ্রহ করতে যাওয়া মৌয়ালদের কাছ থেকে মৌসুমি চাঁদা বাবদ ৪৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং জিম্মি হওয়া ৩০ জন মৌয়ালের কাছ থেকে আরও ৯ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছে। 

একইভাবে খুলনা ও শরণখোলা রেঞ্জ থেকে প্রায় সমপরিমাণ মুক্তিপণ ও চাঁদাবাজি বাবদ অর্থ আদায় করা হয়েছে। তবে চাঁদপাই রেঞ্জের আওতাধীন এলাকা থেকে সবচেয়ে বেশি চাঁদা আদায়ের তথ্য রয়েছে। চলতি মৌসুমে সেখানকার জেলেপ্রতি ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা আদায় করছে দস্যুরা। এভাবে অন্তত ২৫ কোটি টাকার ওপরে আদায় হয়েছে এ রেঞ্জ থেকে। সহজ কথায়, বৈধ পারমিট নিয়ে বনে গেলেও সুন্দরবনের নিরীহ জেলে ও মৌয়ালদের দস্যুদের হাত থেকে বাঁচতে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে।

অভিযান চলছে, আতঙ্ক কাটছে না

কোস্টগার্ড জানায়, ‘রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ অভিযানে গত ১৯ মাসে ৬৯ দস্যু ও সহযোগী আটক হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ৬৭টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৩০০ রাউন্ড গুলি। জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন ১০৪ জেলে ও দুই পর্যটক।

শ্যামনগর থানার ওসি খালেদুর রহমান জানান, মুক্তিপণের টাকা লেনদেনে ব্যবহৃত মোবাইল ট্র্যাক করে কয়েকজন বিকাশ ব্যবসায়ী ও দস্যুদের সহযোগীকে আটক করা হয়েছে। তবে বনজীবীরা বলছেন, সমন্বিত অভিযান ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। ‘দস্যুমুক্ত’ সুন্দরবন আবারও জলদস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে।

আরও পড়ুন

×