খরতাপে মরছে ঘেরের মাছ ও ক্ষেতের গাছ
পানি শুকিয়ে যাওয়ায় চিংড়ি চাষ করতে পারছেন না চাষিরা। গত রোববার খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাজীরহুলা বিলের একটি ঘেরে - সমকাল
এম এ এরশাদ, ডুমুরিয়া (খুলনা)
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
তীব্র তাপদাহে পানি সংকট দেখা দিয়েছে খুলনার ডুমুরিয়ায়। অনিশ্চয়তায় পড়েছেন চিংড়ি ঘেরের মালিক ও সবজি চাষিরা। ঘেরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সার্বক্ষণিক তদারকি করেও চিংড়ি মাছ বাঁচানো যাচ্ছে না। চাষিরা জানিয়েছেন, পানির সংকটে সবজি গাছও মরে যাচ্ছে। এ অবস্থা আরও কিছুদিন থাকলে কোটি কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলার আরশনগর বিলে ৩৬ বিঘা জমিতে চিংড়ি ঘের রয়েছে আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগর গ্রামের মিজানুর রহমানের। সেখানে তিনি ৪০ হাজার বাগদা পোনা ছেড়েছিলেন। মিজানুর বলেন, প্রচণ্ড তাপদাহে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সব মাছ মারা গেছে। এতে পাঁচ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে।
৪০ বিঘা জমির ঘেরে এক লাখ বাগদা চিংড়ি পোনা ছেড়েছিলেন ছোট মুড়াবুনিয়ায় প্রশান্ত কুমার ঘোষ। তিনি জানান, সব পোনা মারা গেছে। তাঁর ১০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কার্যালয়ের তথ্যমতে, ১৪টি ইউনিয়নে গত মৌসুমে ১১ হাজার ১৪৬ হেক্টর ঘেরে ৭ হাজার ৫৭৮ টন গলদা চিংড়ি উৎপাদিত হয়েছে। বিক্রি হয়েছে ৬০৬ কোটি ২৪ লাখ টাকায়। ৬ হাজার ৬৮১ হেক্টর ঘেরে উৎপাদিত ২ হাজার ৬১২ টন বাগদা বিক্রি হয়েছে ২৩৫ কোটি ৮ লাখ টাকায়। এ ছাড়া হরিণা (ছোট চিংড়ি) ১৪ কোটি ৫০ লাখ, কার্প জাতীয় সাদা মাছ ৪০৫ কোটি ৫০ লাখ ও অন্যান্য মাছ ৭৫ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে।
চলতি মৌসুমে মাছ চাষ হয়েছে ২২ হাজার ১৪৪ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে বাগদা ৬ হাজার ৭৮১ হেক্টর, গলদা ১১ হাজার ১৪৬ হেক্টর ও কার্পসহ অন্য মাছ চাষ হচ্ছে ৪ হাজার ২৫৭ হেক্টর জমিতে। চাষিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাপদাহে ইতোমধ্যে প্রায় ৫ হাজার ঘেরের গলদা, বাগদা ও কার্প জাতীয় মাছ মারা গেছে। এতে মাছ চাষিদের প্রায় শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ডুমুরিয়া গ্রামের মাছচাষি মো. নুরুল ইসলামের ৯ বিঘা আয়তনের ঘের আছে শোভনা ইউনিয়নের কাকমারি গ্রাম এলাকায়। তিনি বলেন, এ বছর মাছ মারা যাওয়ায় চাষিদের ক্ষতি ভয়াবহ। একই ইউনিয়নের কাঁটাখালী গ্রামের মো. হাবিবুর রহমান, হেকমত আলী শেখ, মো. হাফিজুর রহমান ও মণিলাল বিশ্বাস জানালেন, তাপদাহ থেকে মাছ রক্ষায় ঘেরের পানির ওপর মাচা বানিয়ে আশ্রয়স্থল তৈরি করেছেন। তবুও মাছ বাঁচানো যাচ্ছে না। তবে এসব মাছচাষির কেউই উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার চেহারা দেখেননি বলে জানান।
মাছচাষিরা জানান, এবার তারা ভাইরাসমুক্ত রেণুর দিকে ঝুঁকেছিলেন। দেশীয় হ্যাচারির পাশাপাশি ভারত থেকেও রেণু সংগ্রহ করেন। আটলিয়া ইউনিয়নের কাঁঠালতলা গ্রামের প্রকাশ কুমার বিশ্বাসের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতি হাজার রেণুর জন্য তাদের গুনতে হয়েছে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। দেশীয় চিংড়ির জন্য যে খাবার দেওয়া হয়, তা আবার ভারত থেকে আনা চিংড়ির উপযুক্ত নয়। ফলে ভিন্ন ভিন্ন খাবার চড়া দামে কিনতে হয়। বেশির ভাগ চাষিই ঘেরের জন্য এনজিও থেকে ঋণ বা সুদে টাকা নিয়েছেন। গরমের কারণে খালবিলে পানি নেই। মাছ মারা যাচ্ছে। ফলে এবার তারা ঋণের ফাঁদে পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন।
এদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ডুমুরিয়ার ৫ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয় ১ লাখ ১২ হাজার টন। উৎপাদিত সবজি ১৭৬ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে। পানি সংকটের কারণে এবার একই পরিমাণ জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সন্দিহান কর্মকর্তারা।
সাহস গ্রামের কৃষক সৈয়দ সাইফুর রহমান দেড় বিঘা জমিতে বেগুনসহ অন্যান্য সবজি আবাদ করেছেন। গত বছর এই সময়ে খরচ বাদে চার লাখ টাকার সবজি বিক্রি করেছিলেন। এবার বিক্রি হয়েছে মাত্র এক লাখ টাকার। এবার তাঁর পানির অভাবে সবজির ক্ষেতে সমস্যা হচ্ছে। গাছগুলো মারা যাচ্ছে।
খর্নিয়া গ্রামের আবুল কাশেম এক বিঘা ও বিকাশ মণ্ডল দুই বিঘা জমিতে চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু পানি সংকটে চাষ শুরুই করতে পারেননি। গত বছর সবজি বিক্রি করে ভালো লাভ করেছিলেন জানিয়ে এই দুই চাষি বলেন, পানি সংকটে এবার চাষের আশাই ছেড়ে দিয়েছেন।
ডুমুরিয়া সদরের আল্লাহর দান কাঁচাবাজার আড়তের মালিক জিএম আনিচুর রহমান বলেন, সবজি চাষের ভরা মৌসুমে পানি সংকটে চাষিরা বিপাকে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতি আরও কিছুদিন থাকলে প্রায় ৮ কোটি টাকার ক্ষতি হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, চলতি মৌসুমে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে এখন খাল-বিল কোথাও পানি নেই। অনাবৃষ্টির কারণে চাষিদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে। মারা যাচ্ছে ঘেরের চিংড়ি। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষের দিকেও বৃষ্টি হচ্ছে না।
ডুমুরিয়ায় কাজী সামছুর রহমান মৎস্য আড়তের মালিক কাজী ফরিদ আহমেদের ভাষ্য, তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, পানি সংকট ও তাপদাহের কারণে চলতি মৌসুমে চিংড়ি ও কার্প জাতীয় বিভিন্ন সাদা মাছ ব্যাপক হারে মারা গেছে। তাঁর ধারণা, এতে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা সোয়েল মো. জিল্লুর রহমান রিগানের দেওয়া তথ্যমতে, তাপদাহের সময় মাছের খামারে অন্তত তিন ফুট পানি থাকা প্রয়োজন। না হলে পানির তাপ বেড়ে অক্সিজেন সংকটে মাছ মারা যেতে পারে। তাঁর কাছে চাষিদের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, সে তথ্য নেই। খোঁজ নিয়ে জানাবেন। তিনি আরও বলেন, এবার ডুমুরিয়ায় ১১ হাজার টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। মাছ বিক্রি করে ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা আয় হতো। পানি সংকটে ঘেরের মাছ মারা গেলে চাষিদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
- বিষয় :
- মাছ