সুন্দরবনে কোস্টগার্ড স্টেশনে হামলা-ভাঙচুর, আহত ১৫
মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকায় বৃহস্পতিবার কোস্টগার্ড আউটপোস্টের পন্টুনে হামলা চালায় উত্তেজিত জনতা (ছবি-সমকাল)
মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ২০:১০ | আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ | ২১:০১
নিখোঁজ এক যুবকের সন্ধান চেয়ে আয়োজিত মানববন্ধন ঘিরে বৃহস্পতিবার বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন চিলা ইউনিয়নের জয়মনির ঘোল এলাকায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের হারবারিয়া স্টেশনে হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে কোস্টগার্ডের কয়েক সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। ঘটনার পর থেকে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত কোস্টগার্ড, পুলিশ ও র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নিখোঁজ মিরাজ শেখের সন্ধান চেয়ে তাঁর স্বজন ও গ্রামবাসী জয়মনির ঘোল এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এক পর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ জনতার একটি অংশ সেখানে অবস্থিত কোস্টগার্ডের হারবারিয়া চেকপোস্ট ও স্টেশনে হামলা চালায়। হামলাকারীরা কোস্টগার্ডের স্পিডবোট, পন্টুন অফিস এবং বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও মালপত্র ভাঙচুর করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় কোস্টগার্ড সদস্যদের ওপর সরাসরি হামলা ও স্টেশনের পন্টুনে ভাঙচুর করা হয়। এ সময় কয়েকজন কোস্টগার্ড সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোস্টগার্ড সদস্যরা কয়েক রাউন্ড ব্ল্যাঙ্ক কার্টিজ নিক্ষেপ করে। যদিও এসব কার্টিজে প্রাণঘাতী গুলি থাকে না। তবে গুলির মতো শব্দ সৃষ্টি হয়।
খবর পেয়ে অতিরিক্ত কোস্টগার্ড, পুলিশ ও র্যাব সদস্য দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিপেটা করলে নারী-পুরুষসহ অন্তত ১০ জন গ্রামবাসী আহত হন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
চিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গাজী আকবর হোসেন বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি এলাকায় ছিলাম না। স্থানীয়দের কাছ থেকে কোস্টগার্ডের ওপর এলাকাবাসীর হামলা-ভাঙচুরের বিষয়টি জানতে পেরেছি।’ স্থানীয় ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার সূত্রপাতের পর ঘটনাস্থলে যাই। তখন পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত ছিল। আমি উত্তেজিত গ্রামবাসীকে শান্ত করার চেষ্টা করেছি।’
মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমান বলেন, ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ, কোস্টগার্ড ও র্যাব মোতায়েন রয়েছে। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো পক্ষ থানায় মামলা করেনি। তবে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
কোস্টগার্ডের বক্তব্য
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সদরদপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে, জয়মনির ঘোলে অবস্থিত কোস্টগার্ড স্টেশন হারবারিয়ায় এক দল দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেছেন। এতে দায়িত্ব পালনরত কয়েক সদস্য আহত হয়েছেন। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বনদস্যু দমন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কোস্টগার্ড দীর্ঘদিন ওই এলাকায় টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে আসছে। জয়মনির ঘোল বনদস্যু ও তাদের সহযোগীদের অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সেখানে কোস্টগার্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়।
কোস্টগার্ডের দাবি, স্টেশন স্থাপনের ফলে বনদস্যুদের কাছে রসদ, অস্ত্র ও অন্যান্য লজিস্টিকস সহায়তা পৌঁছানোর পথ অনেকাংশে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে বনদস্যু ও তাদের সহযোগীরা কোস্টগার্ডের উপস্থিতি মেনে নিতে পারছে না। প্রাথমিক তদন্ত ও স্থানীয় পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ও অসাধু চক্র নিজেদের অপকর্ম পরিচালনার সুবিধার্থে পরিকল্পিতভাবে হামলা, ভাঙচুর ও অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য সুন্দরবনে বনদস্যু দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোস্টগার্ডের চলমান কার্যক্রম ব্যাহত করা এবং বাহিনীকে ওই এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া।
কোস্টগার্ড জানিয়েছে, হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। পাশাপাশি কোনো ধরনের হামলা, ভয়ভীতি বা অপপ্রচারে দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত না হয়ে সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
উল্লেখ্য, জয়মনির ঘোল এলাকার মিরাজ শেখ (৩২) নামে এক যুবক গত ১০ এপ্রিল নিখোঁজ হন। তাঁর স্বজনদের দাবি, কোস্টগার্ড পরিচয়ে মিরাজ শেখকে তুলে নেওয়া হয়েছে। তাঁর সন্ধান দাবিতে স্বজনরা পর্যায়ক্রমে সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন। কোস্টগার্ড এ ঘটনায় তাদের বাহিনীর কোনো সম্পৃক্ততা থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে।
- বিষয় :
- কোস্টগার্ড
- হামলা
- ভাঙচুর
- সুন্দরবন
