সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া ১১ জেলের খোঁজ নেই ৬ মাস
হদিস মিলছে না ট্রলারেরও
আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৯:২৪ | আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ | ১০:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া ১১ জেলের খোঁজ মিলছে না ছয় মাস ধরে। ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি তারা। ট্রলার কোথায়, তাও জানেন না সেটির মালিক। জেলেদের সন্ধানে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছেন পরিবারের সদস্যরা।
চট্টগ্রাম নগরের কর্ণফুলী নদীর পারে ফিশারি ঘাট থেকে গত বছর ৮ ডিসেম্বর যাত্রা করেছিলেন তারা। ৯ ডিসেম্বর থেকে তাদের সবার মোবাইল ফোন বন্ধ। জেলেদের সন্ধানে কেউ ছুটছেন ট্রলার মালিকের বাড়িতে; কেউ যাচ্ছেন সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে এবং ঢাকায় মিয়ানমারের দূতাবাসে। কোথাও খোঁজ না পেয়ে একজন করেছেন মামলা।
নিখোঁজ মাঝি মো. আলমগীরের মেয়ে জেসমিন বেগম বলেন, ‘আমার জন্মের আগে থেকেই বাবা বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে আসছেন। গত বছর ডিসেম্বরে এফবি শরিফা-২ ট্রলার নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যান। যেদিন সাগরে যান, ওই দিন থেকেই কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। বাবার নেতৃত্বে যাওয়া আরও ১০ জেলের কারও খোঁজ নেই। ট্রলার মালিক থেকে শুরু করে মিয়ানমার দূতাবাস, মন্ত্রণালয়, পুলিশ প্রশাসনের দপ্তরে ঘুরেও কোনো হদিস পাচ্ছি না। বাবা বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন কেউ কিছু জানাতে পারছেন না।’ জেসমিন আরও বলেন, ট্রলার মালিকপক্ষ সঠিক তথ্য দিচ্ছে না। কখনও বলছে জেলেরা মিয়ানমারের কারাগারে বন্দি। আবার বলছে কোথায় আছে জানে না।
এফবি শরিফা-২ ট্রলারের পরিচালক মাছ ব্যবসায়ী মাইন উদ্দিন নাহিদ বলেন, ‘আলমগীর মাঝিসহ ১১ জেলে মাছ ধরতে সাগরে যান। কিন্তু যাওয়ার সময় মিয়ানমারে পাচারের জন্য চট্টগ্রাম থেকে সিমেন্ট নিয়ে গেছেন। চোরাচালানের ঘটনায় মিয়ানমার কোস্টগার্ডের হাতে ধরা পড়ে কারাগারে বন্দি রয়েছেন বলে শুনেছি। আমি ট্রলারটি ভাড়ায় এনে অন্যজনকে ভাড়া দিয়েছিলাম।’ ব্যবসায়ী মাইন উদ্দিন আরও বলেন, মিয়ানমার কারাগারে বন্দি ছিলেন এমন একজন জেলে আলমগীর মাঝিকে সেখানে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু এর কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। ট্রলারটি মিয়ানমার কোস্টগার্ডের জিম্মায় রয়েছে বলে শুনেছেন।
তদন্তে নেমে পুলিশ ১১ জেলের একজনের মোবাইলের সর্বশেষ লোকেশন হাতিয়ার আশপাশে দেখতে পেয়েছেন। আলমগীর ছাড়া নিখোঁজ অন্য জেলেরা হলেন মো. মামুন, ইমাম উদ্দিন হোসেন, মো. রুবেল, তছির আহমেদ, মিলন মিয়া, ফজলে এলাহী, সালাউদ্দিন, ইসমাইল ও আজাদ নামে দুজন। তারা নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও নরসিংদীর বাসিন্দা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে জেলের খোঁজ চেয়েছেন কেউ কেউ। কোন হদিস না পেয়ে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন আলমগীর মাঝির মেয়ে জেসমিন। মামলায় ট্রলার মালিক ও ব্যবসায়ী মাইন উদ্দিন নাহিদ, নুরুল ইসলাম রাসেল, মো. বেলাল ও কামাল মেম্বারকে আসামি করা হয়।
জেসমিন বেগমের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর তাঁর বাবা বাসায় থাকা অবস্থায় নুরুল ইসলাম রাসেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এক পর্যায়ে রাসেলের সঙ্গে তাঁর বাবার ঝগড়া হয়। সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে তাঁর বাবা অপহরণ হয়ে থাকতে পারেন। কারণ ট্রলার মালিকদের সঙ্গে মাছ ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব হয়েছিল। তাঁর বাবার খোঁজে বিভিন্ন সরকারি অফিসে যোগাযোগ শুরু করলে নাহিদ তাঁকে ফোনে হুমকি দিয়েছেন।
নোয়াখালীর বাসিন্দা নিখোঁজ আজাদের বাবা জাফর উল্লাহ বলেন, ‘চট্টগ্রামে ট্রলার মালিকের অফিস ও বাসায় গিয়ে কয়েকবার ছেলের সন্ধান চেয়েছি। কিন্তু কোনো তথ্য পাইনি। ছেলে বেঁচে আছে কিনা জানি না। আমাদের ১১ পরিবারে অন্ধকার নেমে এসেছে।’
জেলে নিখোঁজের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই ইমাম হোসেন বলেন, ‘যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের গ্রেপ্তার করেছি। কিন্তু জেলেরা কোথায় আছেন সেই তথ্য তারা দিতে পারেননি। তদন্ত চলছে।’
- বিষয় :
- ট্রলার
