তালতলীর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র
উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো ক্ষতিপূরণ পায়নি
কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। বরগুনার তালতলী থেকে তোলা সমকাল
আবু জাফর সালেহ, বরগুনা
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৯:৪১ | আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ | ১০:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বরগুনার তালতলী কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়েকশ একর জমি প্রতারণার মাধ্যমে জবরদখলের অভিযোগ রয়েছে। প্রকৃত মালিকেরা আজও জমির মূল্য পাননি। উচ্ছেদের শিকার অন্তত ১৪২টি পরিবার ক্ষতিপূরণ পায়নি।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। জালিয়াতি করে ভূমি বন্দোবস্ত নেওয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কৃষকদের জমি দখলে সহযোগিতা করা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এখন আত্মগোপনে রয়েছেন।
আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য ও নদী রক্ষা কমিশনের আপত্তি অগ্রাহ্য করে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা উপেক্ষা করে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। এর ৯৬ শতাংশের মালিক পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না বা পাওয়ার চায়না। ৪ শতাংশের মালিক বাংলাদেশের আইএসওটেক ইলেকট্রিফিকেশন কোম্পানি।
তালতলী উপজেলার খোট্টার চর এলাকায় পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদের মোহনায় ২০১৭ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। এর আশপাশে বেশ কয়েকটি প্রতিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রয়েছে। এর মধ্যে আছে টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভ্যয়ারণ্য, সোনাকাটা ইকোপার্ক, লালদিয়া ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং ফাতরার চর ম্যানগ্রোভ বন। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের শুরুতে জমি অধিগ্রহণের সময় জমির প্রকৃত বাসিন্দাদের কোনো রকম আগাম নোটিশ বা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই সেখান থেকে উচ্ছেদ করা হয়। উচ্ছেদের শিকার বাসিন্দাদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার রাখাইনদের একটি অংশ। অভিযোগ রয়েছে, জমি জবরদখলের কাজটি করেছে আইএসওটেক। তাতে সহযোগিতা দিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও দালাল চক্র।
রাখাইনদের জমি দখল
তালতলী ভূমি অফিসের তথ্যসূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ছোট নিশানবাড়িয়া মৌজায় বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানির নামে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিন হাজার ৪৭১ শতাংশ জমির খাজনা পরিশোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ঝাও জিং-এর নামে অফিসের অনুকূলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৭২৯ শতাংশ জমির খাজনা পরিশোধ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দেয়ালবেষ্টিত এবং নতুন করে তারকাঁটা দিয়ে ঘেরাও দেওয়া জমির মধ্যে ৩১ জন রাখাইনের নামে ২৩২ দশমিক ৫০ একর জমি বন্দোবস্ত দিয়েছিল তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। ১৯৫৫ সালের ২ জুলাই বন্দোবস্ত কেস নিষ্পত্তি হয়ে রেকর্ড রুমে পাঠানো হয়। কিন্তু বন্দোবস্ত মামলার (৩১ জন রাখাইনের নামে দেওয়া) তথ্য গোপন করে ২০০০-২০০১ সালে আবার বন্দোবস্ত নেওয়ার চেষ্টা করেন স্থানীয় প্রভাবশালী সানু খন্দকার। এ নিয়ে আমতলী সহকারী জজ আদালতে মামলা হয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০০৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর আদেশ দেওয়া হয় বন্দোবস্ত মামলা সঠিক। একই আদেশে ২০০০-২০০১ সালের নতুন বন্দোবস্তকৃতদের সরকারি নীতিমালার আলোকে অন্যত্র খাস জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য তৎকালীন আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) নির্দেশ দেওয়া হয়।
বন্দোবস্ত পাওয়া ৩১ জন রাখাইনের মধ্যে ৯ জনের ৬৭ দশমিক ৫০ একর জমি তাপবিদ্যুৎ কোম্পানি কেনে। কিন্তু ২২ জনের ১৬৫ একর কৃষিজমি বিদ্যুৎ কোম্পানি অবৈধভাবে পর্যায়ক্রমে দখল করে নিচ্ছে। ক্ষতিপূরণ ও জমির মূল্য পেতে আদালতে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন রাখাইন নেতা চোথয়ফ্রু মাতুব্বর।
চোথয়ফ্রু মাতুব্বর আরও জানান, ২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তিনিসহ চারজনের কাছ থেকে এক কোটি ৩৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা মূল্যে ২৩ একর ১২ শতাংশ জমি ক্রয়ের চুক্তিবদ্ধ হন আইএসওটেকের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মঈনুল আলম। তাদের ২০ লাখ টাকা নগদ পরিশোধ করা হয়। বাকি এক কোটি ১৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা দলিল রেজিস্ট্রি করার সময় পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু কোম্পানিটি বায়না চুক্তির পর জমি দখলে নিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ করলেও জমি রেজিস্ট্রি করেনি। এমনকি ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে জাল দলিল করাসহ দাতাদের নানা ধরনের হুমকি দেয়।
তালতলী ভূমি অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, ৩১ জন রাখাইনের নামে ২৩২ দশমিক ৫০ একর জমি বন্দোবস্ত ছিল। টাকা দিয়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইএসওটেক কোম্পানি এই ভূমি তাদের নামে নিয়ে গেছে। রাখাইনরা আদালতে গেলে জমি তাদের পক্ষেই থাকবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একই মৌজায় ১৯৭১-৭২ সালে ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ৫১ একর জমি ১৭ জনকে বন্দোবস্ত দেয় সরকার। কিন্তু এ তথ্য গোপন করে বিদ্যুৎ কোম্পানি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও দালাল চক্রের যোগসাজশে নিরীহ ভূমিহীন কৃষকদের উচ্ছেদ করে জমি দখলে নিয়েছে। তালতলী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. রেজবি-উল-কবির জোমাদ্দারসহ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কোটি কোটি টাকা কোম্পানির কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ঘটনায় জমির মালিকরা আদালতে মামলা করেছেন।
এ ছাড়া একাধিক ভূমিহীন পরিবারের বন্দোবস্তকৃত এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অন্যায়ভাবে দখলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে।
বরগুনার আমতলা সড়কের আরিফুর রহমান নামে একজন ভুক্তভোগী সমকালকে জানিয়েছেন, তাদের পৈতৃক মালিকানার ৯ একর জমি বিদ্যুৎ কোম্পানি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে। জমির দাম দেওয়ার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত পরিশোধ করেনি।
জানতে চাইলে তালতলীর খোট্টার চর এলাকার মো. সুলতান শিকদার বলেন, ‘আমি মমাচিন নামে এক রাখাইনের কাছ থেকে জমি কিনেছিলাম। কোম্পানির লোকজন স্থানীয় দালাল ও ভূমিদস্যুর মাধ্যমে একই দাতার কাছ থেকে অন্যায়ভাবে আমার জমির ভুয়া দলিল করে নিয়েছে।’
আইএসওটেক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈনুল আলম বিদেশে চলে গেছেন। আইএসওটেকের ঢাকার বনানী অফিস বন্ধ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, আইএসওটেকের জমি জবরদখলে প্রভাব খাটিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন বরগুনা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. রেজবি-উল কবির জমাদ্দার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান তৌফিকুজ্জামান তনুসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা। তারাও আত্মগোপনে আছেন। এ কারণে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
জমি জবরদখলের অভিযোগের বিষয়ে পাওয়ার চায়না কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও প্রতিষ্ঠানটি কোনো সাড়া দেয়নি।
২০২০ সালের শুরুর দিকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান হাওলাদার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ নদীর এলাকা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কমিশন একই সঙ্গে আরও নির্দেশনা দিয়ে বলেছিল, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যক্তিগত জমির মালিকানা থাকলে তা বাতিল করা হোক। এসব নির্দেশনা মানা হয়নি।
দেশের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর ফোরাম বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিডব্লিউজিইডি) এক গবেষণায় বলেছে, ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে ১৫৩টি পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৪২টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে।
- বিষয় :
- কয়লা
