ঢাকা বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

শূন্যরেখায় অসহায় মা

সন্তানরা রোদে পুড়ছে বৃষ্টিতে ভিজছে, কী হবে জানি না

কুড়িগ্রাম সীমান্তের শূন্যরেখা

সন্তানরা রোদে পুড়ছে বৃষ্টিতে ভিজছে, কী হবে জানি না
×

ছবি : সমকাল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৪:৩৬

একপাশে কাঁটাতারের বেড়া, আরেক পাশে সশস্ত্র প্রহরা। কোনো দিকে যাওয়ার উপায় নেই। মাথার ওপরও নেই স্থায়ী কোনো ছাদ। গা কখনও তপ্ত রোদে পুড়ে যায়, আবার কখনও ভিজে যায় বৃষ্টিতে। এই অবস্থায় দুই শিশুসন্তানকে বুকে জড়িয়ে তিন দিন ধরে শূন্যরেখায় আটকে আছেন সুমি আক্তার। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা সীমান্তের গয়টাপাড়া এলাকার সীমান্তে গত রোববার ভোর থেকে স্বামী-সন্তানসহ অসহায় অবস্থায় দিন কাটছে তাঁর।

সুমির সঙ্গে রয়েছেন স্বামী বিল্লাল হোসেন, চার বছরের মেয়ে ফাতেমা এবং মাত্র পাঁচ মাসের সুমাইয়া। গতকাল মঙ্গলবার নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, বাচ্চাগুলোর জন্যই বেশি কষ্ট হয়। রোদে পুড়ছে, বৃষ্টিতে ভিজছে। কখন কী হবে, জানি না।

সুমি জানান, অপুষ্টি আর খাদ্য সংকটে ভুগছে তাঁর দুই সন্তান। খিদার জ্বালা সইতে না পেরে ছটফট করছে।

তিনি আরও বলেন, ‘কী রইদ (রোদ) কী বৃষ্টি! আল্লাহ মাফ করুক। মাইয়্যাটা রুটি-কলা খায়া কোনোমতে বেঁচে আছে। ছোট বাচ্চাটা পাঁচ মাস হইলো দুধ ছাড়া কিছু খায় না।’

পরিবারটির দাবি, তাদের জোর করে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। শুধু সুমির পরিবারই নয়, একইভাবে আরও কয়েকজনকে সীমান্তে এনে রেখে গেছে বিএসএফ। 

জানা গেছে, বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠকের পরও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। 

স্থানীয়দের ভাষ্য, তিন দিন ধরে ছোট দুটি শিশুকে নিয়ে সুমির এই দুর্বিষহ অবস্থান তাদের নাড়া দিয়েছে। কেউ খাবার দিচ্ছেন, কেউ পানি। মানবিক বিবেচনায় পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন সীমান্ত এলাকার মানুষ।

স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাচ্চাগুলো যেভাবে আছে, সেটা খুব কষ্টের। দ্রুত একটা সমাধান হওয়া দরকার।

আরেক বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, শিশু ও নারীদের এভাবে সীমান্তে ফেলে রাখা মানবিকতার পরিপন্থি। আমরা চাই দ্রুত তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা হোক।

সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী এক বিজিবি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের খাবার, পানি ও একটি ছাতা দেওয়া হয়েছে। শিশুগুলোর কষ্ট দেখে খারাপ লাগে।

বিজিবি সূত্র জানায়, গত রোববার ভোরে গয়টাপাড়া ও ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে মোট ৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিজিবি সেই চেষ্টা প্রতিহত করে। এর পর থেকেই তারা শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।

জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানে বিএসএফকে আবারও পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে এখনও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

পুশইনে সহায়তা করায় সাত বাংলাদেশি আটক 
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রোকনপুর সীমান্ত দিয়ে আবারও এক নারীকে পুশইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। তবে বিজিবি সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে। এদিকে বিএসএফের পুশইন কার্যক্রমে সহায়তা করার অভিযোগে সাত বাংলাদেশিকে পুলিশে সোপর্দ করেছে বিজিবি।

বিজিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত সোমবার রাত পৌনে ১১টার দিকে নওগাঁ ১৬ বিজিবির অধীন চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোকনপুর সীমান্ত দিয়ে ৮৮ ব্যাটালিয়ন বিএসএফ কয়েকজন মাঝির সহায়তায় নৌকাযোগে এক নারীকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে। বিজিবি টহল দলের বাধায় ওই নারীকে নিয়ে ফিরে যায় বিএসএফ।

এর আগে ১৩ জুন একই সীমান্ত দিয়ে ১৫ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে তখনও তাদের সে চেষ্টা পণ্ড করে দেয় বিজিবি। পরে বিএসএফ ওই ১৫ জনকে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। এদিকে পুশইনে সহায়তা করার অভিযোগে সাত বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করে বিজিবি। পরে তাদের গোমস্তাপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়। আটককৃতরা হলেন– গোমস্তাপুর উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের রোকনপুর গ্রামের বাবুল আক্তার, এমদাদুল হক, রয়েল, আজম, আলম, আসমাউল ও মেজবাউল। 

গোমস্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরে আলম জানান, বিএসএফের পুশইন কার্যক্রমে সহায়তা করার অভিযোগে সাত বাংলাদেশিকে পুলিশে সোপর্দ করেছে বিজিবি। সোমবার রাতেই তাদের থানায় হস্তান্তর করা হয়।

জামালপুরে বাংলাদেশে ঠিকানা না থাকা যুবককে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার মধ্যেরচর সীমান্তে গত সোমবার রাতে এক যুবককে পুশইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয় লোকজনের বাধায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে ওই যুবক শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই যুবক বাংলাদেশের কোনো ঠিকানা দিতে পারেননি। এ দেশের কোন জেলায় বা কোন এলাকায় তার বাড়ি তা–ও জানাতে পারেননি। তবু বিএসএফ তাকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে।  

সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাতে মধ্যেরচর এলাকায় আন্তর্জাতিক শূন্যরেখা অতিক্রম করে আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করেন। বিষয়টি টের পেয়ে বিজিবি সদস্য এবং স্থানীয় লোকজন দ্রুত সেখানে গিয়ে তাকে আটকে দেন এবং জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদে ওই ব্যক্তি প্রথমে নিজেকে বাংলাদেশি বলে দাবি করলেও নিজের নাম-ঠিকানা বা পরিচয় দিতে পারেননি। পরে বিজিবি ও স্থানীয়রা তাকে পুনরায় শূন্যরেখায় পাঠিয়ে দেয়।

জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান জানান, বিএসএফ এখন কৌশল বদলে দুর্গম ও পাহাড়ি অঞ্চলগুলো দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার রাতে ওই এলাকায় একজনকে পুশইনের চেষ্টা করেছিল বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের কড়া নজরদারি ও বাধার মুখে তা সফল হয়নি।
 
উল্লেখ্য, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের পর আবার পুশইনের চেষ্টা শুরু করে বিএসএফ। বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন সীমান্তে ভারতের নারী, পুরুষ ও শিশুকে এ দেশে ঠেলে দিতে চায় ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনি। তবে স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে তাদের ভারতে ফেরত পাঠায় বিজিবি। এ নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী কোথাও কোথাও মুখোমুখি অবস্থান নেয়। উত্তেজনা ছড়ায় সীমান্ত সংলগ্ন দুই পারের মানুষের মধ্যেও। 

অবৈধ পুশইন বন্ধে বরাবরই সোচ্চার বিজিবি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও সমালোচনা করে এই প্রবণতার। তবু থেমে নেই বিএসএফের পুশইন চেষ্টা। প্রায় প্রতি দিনই সীমান্তের কোনো না কোনো স্থানে পুশইনের চেষ্টা করে তারা। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী সদাসতর্ক থাকায় তাদের সে চেষ্টা সফল হয়নি।

এদিকে পুশইনের জন্য সীমান্তে জড়ো করা ব্যক্তিদের শূন্যরেখায় রেখে কড়া পাহারায় থাকে বিএসএফ। মানুষগুলো রোদ–বৃষ্টিতে ভিজে মানবতের জীবন কাটালেও ভারত সরকার তাদের ফেরত নেওয়ার তাগিদ অনুভব করে না। বিভিন্ন স্থানে বিজিবি–বিএসএফ পতাকা বৈঠকের পরও ভুক্তভোগীদের অভুক্ত অবস্থায় দেখা গেছে শুন্যরেখায়।

২০২৬ সালে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, জামালপুর, সিলেট ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে এ বছর কোনো সীমান্ত দিয়েই পুশইনে সফল হতে পারেনি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনি। এর আগে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৩৫৬ জনকে  বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে পুশইন করা হয়। 

(প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য)

আরও পড়ুন

×