হাওরপাড়ের বিদ্যালয়
বর্ষায় কমে উপস্থিতি, দুই পোশাক নিয়ে যেতে হয় স্কুলে
ছবি- সমকাল
তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ১৫:৩৪
বর্ষা মৌসুম এলেই সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার হাওরপাড়ের অর্ধশতাধিক গ্রামের হাজারো শিশুর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। যোগাযোগের দুরবস্থার কারণে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। ফলে কেউ শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ছে, কেউ আবার গৃহস্থালি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এতে প্রতিবছরই প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার বাড়ছে।
উপজেলায় সাতটি ইউনিয়নে মোট ২৪৯টি গ্রাম রয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে মাত্র ১৩৪টি গ্রামে। বাকি ১১৫টি গ্রামে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। সদর, বাদাঘাট, বালিজুরী ও উত্তর বড়দল ইউনিয়নে সড়ক যোগাযোগ তুলনামূলক ভালো হওয়ায় শিক্ষার্থীরা পাশের গ্রামে গিয়ে পড়াশোনার সুযোগ পায়। তবে শ্রীপুর দক্ষিণ, উত্তর শ্রীপুরের কিছু অংশ এবং দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন হাওরবেষ্টিত হওয়ায় বর্ষাকালে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান, বর্ষার ছয় মাস বিদ্যালয়বিহীন গ্রামের শিশুদের বড় একটি অংশ স্কুলমুখী থাকে না। পরে হেমন্ত মৌসুমে তারা কৃষিকাজ বা পারিবারিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। একসময় অনেকেই আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসে না।
সম্প্রতি উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের মন্দিয়াতা, নতুনহাটি, মুজরাই, পানিয়াখালীসহ বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সী শিশুরা দলবেঁধে খেলাধুলা করছে। একই চিত্র দেখা গেছে বেতাগড়া, জামালপুর, তেলিগাঁও পশ্চিমপাড়া, কৃষ্ণতলা, গোপালপুর, রাজধরপুর, উজ্জ্বলপুর, জগদীশপুর, সাহসপুর, নিশ্চিন্তপুর, লতিবপুর, গোবিন্দপুর ও টুকেরগাঁওসহ অর্ধশতাধিক গ্রামে।
দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের রাজধরপুর গ্রামের অভিভাবক হাদিসনূর বলেন, নিজ গ্রামে স্কুল নেই, আবার অন্য গ্রামে যাওয়ারও কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই অনেক পরিবার শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারে না।
শাহগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুবাশ্বির আলম বলেন, বর্ষাকালে যোগাযোগ সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যারা আসে, তাদের দুই সেট পোশাক নিয়ে আসতে হয়। গ্রামের প্রায় ২০০ মিটার রাস্তা বর্ষার শুরুতেই পানির নিচে তলিয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে স্কুলে এসে ভেজা পোশাক বদলাতে হয়।
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী পলি সরকার জানায়, স্কুলে যাওয়ার পথে সব সময় হাঁটুর ওপরে পানি থাকে। তাই বাড়ি থেকে অতিরিক্ত পোশাক নিয়ে আসতে হয়।
হাওরাঞ্চলে কর্মরত উন্নয়ন সংস্থা সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স সার্ভিস (সিএনআরএস)-এর তাহিরপুর উপজেলা সমন্বয়কারী ইয়াহিয়া সাজ্জাদ বলেন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ করতে নৌকার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে জনতা উচ্চ বিদ্যালয় ও মোয়াজ্জেমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য ইঞ্জিনচালিত নৌকা দেওয়া হয়েছিল, যা শিক্ষার্থীদের অনেক উপকার করেছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, বিদ্যালয়ের স্লিপ তহবিলের অর্থ ব্যবহার করে নৌকা তৈরি করা সম্ভব। এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন প্রধান শিক্ষককে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি গ্রামে একটি করে বিদ্যালয় স্থাপন করা গেলে হাওরাঞ্চলের এ সমস্যা অনেকটাই দূর হবে। প্রধানমন্ত্রী সারাদেশের প্রতিটি গ্রামে একটি করে বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে বিদ্যালয়বিহীন গ্রামের তালিকা চাওয়া হয়েছে।
