ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর ৭০ শতাংশ ১৫ এলাকার

হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর ৭০ শতাংশ ১৫ এলাকার
×

 চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। শয্যা স্বল্পতার কারণে একই বেডে রেখে একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়াদের মধ্যে দেড় হাজার শিশুর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাদের প্রায় ৭০ শতাংশ ১৫টি এলাকার। কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় আক্রান্ত বেশি হওয়ায় উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য প্রশাসন।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়াদের মধ্যে দেড় হাজার শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করেছে সমকাল। দেখা গেছে, তাদের এক হাজার ৩৩ জন ১৫টি এলাকার। এই এক হাজার ৩৩ শিশুর মধ্যে ৬২১ জনের বয়স দেড় বছরের নিচে। ভর্তি হওয়াদের অর্ধেকের বেশি শিশুকে কোনো টিকা দেওয়া হয়নি। ৩০ শতাংশ শিশু এক ডোজ টিকা পেয়েছে।

১৫টি এলাকা হলো– মহানগরের বাকলিয়া, বন্দর-পতেঙ্গা, কোতোয়ালি, হালিশহর, চান্দগাঁও, পাহাড়তলী-ডবলমুরিং, বায়েজিদ ও খুলশী। উপজেলার মধ্যে আছে– বোয়ালখালী, বাঁশখালী, কর্ণফুলী, পটিয়া, সীতাকুণ্ড ও হাটহাজারী। অন্য এলাকাটি হলো কক্সবাজার। এসব এলাকার বেশ কয়েকজন এরই মধ্যে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। শারীরিক অবস্থা জটিল হওয়ায় অনেককে টানা চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কিছু জায়গায় অনেক শিশু আক্রান্ত হওয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিচতলার ‘হাম ব্লকে’ সাধারণ ৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন ভর্তি থাকছে ৭০ থেকে ৮০ শিশু। একই শয্যায় একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ভর্তি থাকাদের মধ্যে প্রতিদিনই অন্তত ৮ থেকে ১০ শিশুর প্রয়োজন হয় পিআইসিইউ (শিশুদের জন্য বিশেষ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) সেবার। শয্যা স্বল্পতার কারণে বেশির ভাগ শিশুর সেখানে সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকে না। হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য ১৫টি পিআইসিইউ শয্যা রয়েছে।

সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে জানা গেছে, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন নতুন করে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। গত চার দিনে ভর্তি হয়েছে ২০৩ জন। গত দুই সপ্তাহে ভর্তি হয়েছে ৯৪৩ শিশু। এ পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে তিন হাজার ৪২৪ জন।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, ‘হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুর সংখ্যা এখনও সেভাবে কমেনি। শয্যার তুলনায় বাড়তি রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মুমূর্ষু অনেক শিশুর আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হলেও জরুরি মুহূর্তে দেওয়া সম্ভব 
হচ্ছে না। মাত্র ১৫টি পিআইসিইউ শয্যা নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে আমাদের।’ শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, ‘অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই ভাইরাসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা এখনও না কমায় আমরা চিন্তিত। 
একই এলাকার অনেক শিশুর শরীরে হাম ও হামের উপসর্গ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। যাদের অনেকের বয়স খুবই কম। সেই সঙ্গে একডোজও টিকা পায়নি এমন শিশুর সংখ্যাও বেশি। এ কারণে বেশ কিছু দিন টানা চিকিৎসার প্রয়োজন হচ্ছে বেশির ভাগ শিশুর।’

শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, ‘অত্যন্ত ছোঁয়াছে এই ভাইরাসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা এখনও না কমায় আমরা চিন্তিত। একই এলাকার অনেক শিশুর শরীরে হাম ও হামের উপসর্গ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। যাদের অনেকের বয়সও কম। সেই সঙ্গে এক ডোজও টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বেশি। এ কারণে বেশ কিছুদিন টানা চিকিৎসার প্রয়োজন হচ্ছে বেশির ভাগ শিশুর।’
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহঙ্গীর আলম বলেন, ‘হাম শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত দুর্বল করে দেয়। এ কারণে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা সৃষ্টি হয়। কয়েকটি এলাকার শিশু কেন বেশি আক্রান্ত হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক শিশুকে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকার আওতায় আনা হয়েছে।’
চার দিন ধরে হামে আক্রান্ত আড়াই বছরের শিশুরকে নিয়ে বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতালে থাকা চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার বাসিন্দা মো. মহিম বলেন, ‘আমার সন্তানের শরীরে হঠাৎ জ্বর দেখা দেয়। মুখে কিছু খেতে চায় না সে। স্থানীয় এক চিকিৎসককে দেখানো হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এর মধ্যে কপাল, পেটসহ শরীরের কয়েকটি স্থানে লালছে ফুসকুড়ি দেখা যায়। পরে হাসপাতালে ভর্তি করি। হামের পরীক্ষায় পজেটিভ রিপোর্ট আসে। ছোট্ট ছেলেটি সুস্থ হয়ে না উঠায় দুশ্চিন্তার শেষ নেই আমাদের।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অশোক সাহা বলেন, ‘চার মাস ধরে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব হলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় আশানুরূপ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সঠিক সময়ে শিশুদের টিকার আওতায় আনতে না পারায় পরিস্থিতি এতটা খারাপ হয়েছে। সেই সঙ্গে সরকারি চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা ও সমন্বয়হীনতাও এর জন্য দায়ী।’

আরও পড়ুন

×