ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

ইউপি নির্বাচন

ডুমুরিয়ায় বিএনপির কোন্দলে সুবিধায় জামায়াত

ডুমুরিয়ায় বিএনপির কোন্দলে সুবিধায় জামায়াত
×

এম এ এরশাদ, ডুমুরিয়া (খুলনা)

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরই মধ্যে খুলনার ডুমুরিয়ায় ১৪ ইউনিয়নে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগহীন নির্বাচনের মাঠে নতুন সমীকরণের আভাস মিলেছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে দল সমর্থিত প্রার্থীদের চড়া মূল্য দিতে হতে পারে– এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষ নেতারা। বিপরীতে নিজেদের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও বিএনপির কোন্দলে সুবিধা ঘরে তুলতে মরিয়া বিরোধী জোটের নেতৃত্বে থাকা জামায়াতে ইসলামী। 
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোনো ইউনিয়নেই চেয়ারম্যান পদে বিএনপির একক নেতা নেই। নির্বাচনের জন্য মাঠে আছেন দলটির ৪ থেকে ৬ জন নেতা। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থীর নাম জানিয়ে সাংগঠনিক শৃঙ্খলায় জয় তুলে নিতে চায়। তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে কোনো কোন্দলও নেই। তবে এসব বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ের কোনো নেতা এখনই মন্তব্য করতে রাজি হননি। দুয়েকজন কথা বলেছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে। 

অতীত নির্বাচনের সমীকরণ
ডুমুরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৯৭৬ সালের পরবর্তী সময়ে উপজেলায় ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতারা। কয়েক বছর ধরেই জাতীয় পার্টি গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে কার্যত অনুপস্থিত আওয়ামী লীগ। দলটির কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে। যদিও ২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনে উপজেলার ১৪টি ইউপির চেয়ারম্যান পদের ১২টিতেই জিতেছিলেন দলটির নেতারা। বিপরীতে দুটিতে জেতেন বিএনপির নেতারা। ২০২১ সালের নির্বাচনে হিসাব বদলে যায় পুরোপুরি। বিএনপি নেতারা ১২ ইউপিতে ও আওয়ামী লীগ নেতারা দুটিতে জয়ী হন। 
সাধারণ ভোটাররা বলছেন, অতীতে ইউপি নির্বাচনের মাঠে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত প্রার্থীরা ছিলেন হিসাবের বাইরে। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনে দলটির প্রার্থীরা পুরোনো সমীকরণ বদলে দিতে পারেন। আওয়ামী লীগের মাঠে না থাকা ও বিএনপির কোন্দল জাতীয় নির্বাচনের মতোই সুবিধাজনক অবস্থানে এনেছে দলটিকে। ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে আগেভাগেই কৌশলী অবস্থান নিয়ে জামায়াত নেতারা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।

তৃণমূল বিএনপি নেতারা শঙ্কিত
নির্বাচনে প্রার্থিতা বিষয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতাই বক্তব্য দিতে চাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নেতা স্বীকার করেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবার জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অবস্থান ও নির্বাচনী প্রস্তুতি বেশ সুসংহত। ১৪টি ইউপির মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ ইউপিতেই জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীদের চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই নেতারা বলছেন, দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতার নিজস্ব বলয় তৈরি করে রেখেছেন। ভিন্ন ভিন্ন নেতার সমর্থক সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচারে থাকায় সাধারণ নেতাকর্মীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। ফলে তারা চাঙা হতে পারছেন না। এতে হতাশা জানিয়ে তারা বলছেন, যদি দ্রুতসময়ের মধ্যে এই কোন্দল দূর করা না যায়, তবে ১৪টি ইউপির মধ্যে ২-৩টিতে জয় পাওয়াও বিএনপির জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
রংপুর ইউনিয়নের একাধিক বিএনপি নেতাকর্মী সমকালকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই উপজেলা পর্যায়ের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা সালিশ-বিচার, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মাধ্যমে নিজ নিজ আখের গোছাতে ব্যস্ত। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনেও তাদের একটি অংশ টাকার বিনিময়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন। যেখানে বিএনপির প্রায় ৬০-৬৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জেতার কথা, সেখানে বিজয়ী বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিল আড়াই হাজার ভোটের মতো। এই বিএনপি নেতাদের ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ হিসেবে উল্লেখ করে তারা বলছেন, আসন্ন ইউপি নির্বাচনে উপজেলার কোনো ইউপিতে বিএনপি প্রার্থী এমন ঝুঁকি থেকে মুক্ত নন।
একই রকম মন্তব্য করেন সাধারণ ভোটাররাও। তাদের মতে, ডুমুরিয়ায় বিএনপির সবচেয়ে বড় শত্রু অভ্যন্তরীণ কোন্দল। এই কোন্দল চলতে থাকলে আগামী ইউপি নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীরাই পুরো সুবিধা পাবেন। কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, সততা ও বিপদে-আপদে পাশে পাওয়ার বিষয়টিকেই ভোটাররা বেশি বিবেচনায় নেন। তবে তারা শেষ পর্যন্ত দেখতে চান, অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ-বিক্ষোভ মিটিয়ে বিএনপি নেতারা মাঠে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, নাকি জামায়াত নেতারা অনুকূল হাওয়াকে শতভাগ কাজে লাগাতে পারেন।
এই কোন্দলের বিষয় স্বীকার করেন খুলনা জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ও ডুমুরিয়া উপজেলা বিএনপির সদস্য খান ইসমাইল হোসেন। তিনি বলেন, ‘দলীয় কোন্দল রয়েছে, সত্য। তবে ইউপি নির্বাচনে দল যাঁকেই মনোনয়ন দেবেন, তাঁর পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে।’

মাঠ গুছিয়ে নিয়েছে জামায়াত
ইউপি নির্বাচন নিয়ে ডুমুরিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীর মধ্যে প্রকাশ্যে কোনো কোন্দলের তথ্য মেলেনি। তারা নীরবে তাদের নির্বাচনী প্রচারণা ও জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ইউনিয়নে ইতোমধ্যে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাদের সুশৃঙ্খলা কর্মী বাহিনী ঘরে ঘরে যাচ্ছেন। ফলে তারা আওয়ামী লীগের ভোটারদের বড় একটি অংশের কাছ থেকেও সমর্থনের প্রতিশ্রুতি আদায় করেছেন। 
জামায়াতে ইসলামীর ডুমুরিয়া উপজেলা (দক্ষিণ) কমিটির আমির শেখ হাবিবুর রহমানের ভাষ্য, জামায়াতে ইসলামী সুশৃঙ্খল দল। দলীয় সিদ্ধান্তই নেতাকর্মীর কাছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আসন্ন ইউপি নির্বাচনের জন্য একক প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে। তারা মাঠে কাজ করছেন। সাধারণ ভোটারের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
বিএনপির খুলনা জেলা কমিটির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ডুমুরিয়া উপজেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক মোল্লা মোশাররফ হোসেন মফিজের ভাষ্য, ‘দলীয় বার্তা হচ্ছে, দলের অনেকেই মনোনয়ন চাইবেন, তবে নির্যাতিত ও দুর্দিনে যারা মাঠে ছিলেন তাঁকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিএনপির একক প্রার্থী থাকবে।’ কেউ যদি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যান, এর প্রমাণ পাওয়া গেলে, দল তাঁকে ছাড় দেবে না বলেও সতর্ক করে দেন তিনি। 

আরও পড়ুন

×