‘মবের’ নেতৃত্বে ড্যাব নেতাদের এক পক্ষ
বরিশালে স্বাস্থ্যের পরিচালককে টেনে বের করে কক্ষে তালা
কক্ষে তালা দেওয়ার আগে মনিরুজ্জামানকে চেয়ার থেকে তুলতে টানাহেচরা করেন ড্যাব নেতা
বরিশাল ব্যুরো
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগে নবনিযুক্ত পরিচালক ডা. এস.এম মনিরুজ্জামানকে টানাটানি করে বের করে দিয়ে তাঁর কক্ষে তালা লাগানো হয়েছে। এর আগে প্রায় দুই ঘণ্টা তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। বিএনপি সমর্থক চিকিৎসকদের একটি পক্ষের নেতার নেতৃত্বে গতকাল বুধবার এ ঘটনা ঘটে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের (শেবাচিম) কিছু ছাত্র।
বিএনপি সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের নেতা ডা. নজরুল ইসলাম সেলিমকে এসবের নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা পরিচালকের পক্ষ নিলে একাধিকবার দু’পক্ষের বাগ্বিতণ্ডা হয়। বেলা ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি ছিল। কোতোয়ালি থানার ওসির নেতৃত্বে পুলিশ কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করছিল।
জানা গেছে, চিকিৎসকদের দু’পক্ষের বিরোধকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে। গত রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডা. মনিরুজ্জামানকে বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক পদে পদায়ন করে। এর আগে তিনি সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের উপপরিচালক ছিলেন। তিনি গত সোমবার বরিশালে কর্মস্থলে যোগ দেন। এরপর ড্যাবের এক পক্ষের প্ররোচনায় পরিচালককে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে তাঁর অপসারণ চেয়ে আন্দোলন শুরু হয়।
মঙ্গলবার দুপুরে মেডিকেল কলেজের একদল ছাত্র গিয়ে পরিচালকের কক্ষে তালা লাগিয়ে দেন। এর আগেই ৫ দিনের ছুটি নিয়ে সকাল ১০টায় পরিচালক দপ্তর ত্যাগ করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। তবে বুধবার তিনি কর্মস্থলে ফিরে আসেন।
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, পরিচালকের দপ্তরের সামনে পুলিশ অবস্থান করছে। পরিচালক তাঁর কক্ষে আছেন। মহানগর ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন এসে তাঁকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। বেলা ১২টার দিকে অপসারণ দাবি করা মেডিকেল কলেজের প্রায় অর্ধশত ছাত্র সেখানে উপস্থিত হন। পরিচালকের কক্ষে ঢুকতে চাইলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পরে পরিচালকের অনুমতি পেয়ে তারা কক্ষে ঢোকেন। এ সময় ড্যাবের নেতারা একে একে উপস্থিত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন জেলা শাখার সাবেক সভাপতি ডা. আজিজ রহিম ও নজরুল ইসলাম সেলিম, বর্তমান সভাপতি ডা. কবিরুজ্জামান, নাগরিক সংগঠক ডা. মিজানুর রহমানসহ জেষ্ঠ চিকিৎসকরা। নগরীর ১৬ নম্বর ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের ছাত্রদল-যুবদলের কিছু কর্মীও সেখানে জড়ো হন। তাদের মধ্যে যুবদলের মুরাদুল ইসলাম হিমেল জানান, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য তারা জ্যেষ্ঠ নেতাদের নির্দেশে এসেছেন।
মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা পরিচালকের মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে তাঁর সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় লিপ্ত হন। তাদের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনের সময় ডা. মনিরুজ্জামান শেবাচিম হাসপাতালের উপপরিচালক ছিলেন। তখন তিনি আন্দোলনবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে তিনি সুবিধাভোগী ছিলেন। ছাত্রদের পক্ষে জোরালো ভূমিকা নেন ড্যাবের সাবেক সভাপতি ডা. নজরুল। তিনি একাধিকবার উত্তেজিত হয়ে পরিচালকের টেবিলে থাপ্পড় দেন। ছাত্ররা দফায় দফায় স্লোগান দেন।
অভিযোগের বিষয়ে পরিচালক বলেন, তিনি অন্য কোনো অনুষ্ঠানের র্যালি ভেবে আন্দোলনবিরোধী মানববন্ধনে গিয়েছিলেন। চাকরির স্বার্থে তাঁকে অনেক কিছু করতে হয়েছে। তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্রদল এবং এরপর থেকে ড্যাবের সঙ্গে যুক্ত। আন্দোলনের সময় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের অর্থ সহায়তা দিয়েছেন।
বেলা ২টা পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি চলার পর ডা. নজরুল ইসলাম ও ডা. মিজানুর রহমান পরিচালককে অনুরোধ করেন, তাঁকে আপাতত ৫ দিনের ছুটিতে থাকতে হবে। এ সময়ের মধ্যে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমস্যা সমাধান করবেন। ডা. মনিরুজ্জামান এতে রাজি হননি। একপর্যায়ে ডা. নজরুল ওঠে গিয়ে পরিচালককে হাত ধরে টানাটানি করে চেয়ার থেকে ওঠানোর চেষ্টা করেন। এসময় ছাত্ররা মারমুখী স্লোগান দিলে উপস্থিত ছাত্রদল-যুবদল কর্মীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হয়। অন্য চিকিৎসদের অনুরোধে পরিচালক কক্ষ ত্যাগে রাজি হলে ডা. নজরুল ছাত্রদের উদ্দেশে বলেন, তাঁকে কোনো প্রকার হেনস্তা করা যাবে না। এরপর ড্যাব নেতা ও অন্য চিকিৎসকদের সঙ্গে দোতলা থেকে নেমে পরিচালক তাঁর গাড়িতে করে দপ্তর ত্যাগ করেন। একই গাড়িতে তাঁর সঙ্গে যান ডা. মিজানুর রহমান ও ডা. নজরুল ইসলাম। পরিচালক বের হবার পরই ছাত্ররা তাঁর কক্ষে তালা লাগিয়ে দেন।
বুধবার সন্ধ্যায় পরিচালক সমকালকে বলেন, তিনি নিরাপদে বাসায় আছেন। ৫ দিনের ছুটি নিয়েছেন। মন্ত্রণালয় থেকে যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে তিনি সেটি মেনে নেবেন।
ড্যাব সভাপতি ডা. কবিরুজ্জামান মঙ্গলবার জানান, ডা. মনিরুজ্জামান ছাত্রজীবনে ছাত্রদল করেছেন। আওয়ামী লীগের আমলেও ড্যাবের সঙ্গে ছিলেন। শেবাচিম হাসপাতালে প্রশাসনিক পদে থাকায় আওয়ামী লীগ আমলে বিভিন্ন কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হন। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক ডা. মোনায়েম সাদ বলেন, ডা. মনিরুজ্জামান জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করায় তাঁকে পরিচালক নিয়োগ অনেকে মানতে পারছেন না।
ডা. মনিরুজ্জামান শেবাচিম হাসপাতালে ৪ বছর সহকারী পরিচালক ও দুই বছর উপপরিচালক পদে ছিলেন। গত বছর তাঁকে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হয়।
- বিষয় :
- তালা