ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

রোহিঙ্গা শিবিরে নির্ঘুম রাত

রোহিঙ্গা শিবিরে নির্ঘুম রাত
×

কক্সবাজারের উখিয়ার পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গড়ে তোলা রোহিঙ্গাদের বসতি। গত রোববার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প-৫ থেকে তোলা সমকাল

আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

মিয়ানমারে নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন লাখো রোহিঙ্গা। কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষের স্বস্তি নেই। টানা ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধস ও দেয়াল ধসে চার দিনের মধ্যে প্রাণ গেছে ১৩ জনের। নতুন করে ধসের আশঙ্কায় তাদের রাত কাটছে নির্ঘুম। 

রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ জেলার উখিয়া উপজেলার পাহাড় কেটে গড়ে তোলা বিশ্বের বৃহত্তম কুতুপালং আশ্রয়শিবিরে থাকেন। বর্ষা এলেই তাদের মনে ফিরে আসে পাহাড়ধসের আতঙ্ক। গত রোববার রাতে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর ক্যাম্পে পৃথক পাহাড়ধসে প্রাণ যায় আটজনের। এর রেশ কাটতে না কাটতেই গত বুধবার ৫ নম্বর আশ্রয়শিবিরের একটি মহিলা হেফজখানার দেয়াল ধসে ও মাটিচাপায় পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়।

‘আর্তনাদ কানে বাজছে’
বুধবার মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে উম্মে নেজাত (১৩) ও উম্মে সালমা (১২) ৩ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা আব্দুর শুক্কুরের মেয়ে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের মংডুর ছিটাপাড়া গ্রাম থেকে স্ত্রী-সন্তানসহ ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন তিনি। ৯ বছর পর আশ্রয় শিবিরেই দুই মেয়েকে হারিয়েছেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আব্দুর শুক্কুর বলেন, ‘এক দিনেই আমার দুই আদরের মেয়েকে হারালাম। এর চেয়ে বড় কষ্ট একজন বাবার জীবনে আর কী হতে পারে? তারা দুজনই পবিত্র কোরআনের হিফজ সম্পন্ন করেছিল।’
সেদিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, সকালে মেয়েদের নিয়ে একসঙ্গেই ঘর থেকে বের হয়েছিলেন। তিনি ক্যাম্পের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতে যান। মেয়েরা যায় হেফজখানায়। আব্দুর শুক্কুর বলেন, ‘কখনও ভাবিনি, এটাই তাদের সঙ্গে আমার শেষ পথচলা হবে। সন্তান হারানোর যে কত বড় বেদনা, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমি শুধু চাই, আর কোনো বাবাকে যেন এভাবে সন্তান হারানোর শোক বয়ে বেড়াতে না হয়।’

এখনও অনেক পরিবার পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে জানিয়ে তিনি বলেন, টানা বৃষ্টি চলতে থাকলে আরও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান তিনি। 
বেঁচে ফেরা শিক্ষিকা বেগম জাহান বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে কোরআন পড়ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে দেয়াল ভেঙে পড়ল। মুহূর্তেই চারদিকে ধুলায় অন্ধকার হয়ে যায়। শিশুরা চিৎকার করতে করতে যে যেদিকে পারে দৌড়াতে শুরু করে। পশ্চিম পাশের দরজাটি খোলা থাকায় আমরা কয়েকজন বের হতে পেরেছিলাম। কিন্তু পূর্ব পাশে থাকা অনেক শিশু বের হওয়ার সুযোগই পায়নি। তাদের কেউ চাপা পড়ে মারা গেছে, আবার কেউ গুরুতর আহত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এমন ভয়াবহ দৃশ্য জীবনে কখনও দেখিনি। শিশুদের কান্না ও আর্তনাদ এখনও কানে বাজছে।’
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয় বলছে, শুধু ৫, ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর ক্যাম্প নয়, উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে ৯, ১০, ১২, ১৩, ১৪ নম্বরসহ অন্তত ৯টি ক্যাম্প ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। ৯ নম্বর ক্যাম্পটিতে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। অধিকাংশ ক্যাম্পে পাহাড়ের পাদদেশ ও খাড়া ঢালে গড়ে ওঠা বসতিতে বাস করছেন এক লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। 

৯ বছরে ১৫ জনের মৃত্যু
কুতুপালংয়ের পশ্চিম পাশে অবস্থিত ৫ নম্বর (ইরানি) রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ৫২টি ব্লকে প্রায় ৬ হাজার পরিবারের ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ থাকেন এখানে। পাহাড়ঘেরা এই ক্যাম্পে বর্ষা এলেই ফিরে ধসের আতঙ্ক। গত ৯ বছরে এই ক্যাম্পেই পাহাড়ধসে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে পাঁচজনই বুধবার মারা গেছেন।
২০১৭ সালে যখন মিয়ানমার থেকে পালিয়ে রোহিঙ্গারা এখানে আশ্রয় নেন, তখন চার পাশে বড় বড় পাহাড় ছিল। এ তথ্য দিয়ে ক্যাম্পটির হেড মাঝি হামিদ হোসেন বলেন, এখনও ক্যাম্পের চারদিকে পাহাড়, আর মাঝখানে মানুষের বসতি। জায়গা সংকটে অনেকে পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশেও ঘর তৈরি করেছেন। টানা ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। তারা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে অনুরোধ করেন। নানা কারণে অনেকে সেই পরামর্শ মানেন না। 
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রাণহানি রোধে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের লার্নিং সেন্টার-মক্তবসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার রাতে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান এ নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ক্যাম্পে গত তিন দিনের পাহাড়ধসে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। টানা ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

আরও পড়ুন

×