কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি, পানিবন্দি লাখো মানুষ
পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। ছবি-সমকাল
ইব্রাহিম খলিল মামুন, কক্সবাজার
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ২০:৪৭
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। ভারীবর্ষণে তলিয়ে গেছে সড়ক, উপ-সড়ক, ঘরবাড়ি ও ফসলী মাঠ। পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে জেলার ১০ উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নের ৫ লাখের বেশি মানুষ।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোঃ আজাদের রহমান সমকালকে জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। ৬৪০টি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ১৪ হাজার ৬১ জন। সরকারি ভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার নগদ টাকা।
এদিকে শুক্রবার ভোর থেকে বিভিন্ন এলাকায় আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। উপজেলার শতাধিক গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যেই নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে মৃত্যু হয়েছে এক শিশুর। আরও দুই শিশুকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত শিশুর নাম হাসনাতু জান্নাত (১২)। সে উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ গ্রামের আবদুল মালেকের মেয়ে। হাসপাতালে ভর্তি দুই শিশু হলো হাসনাতু জান্নাতের বোন জেরিন মনি (৮) আর শাওরিন মনি (৬)। স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।
কাকরা ইউনিয়নের বাসিন্দা আহমেদুল হক বলেন, ঘরে চাল আছে, তরকারি আছে। কিন্তু রান্না করার জায়গা নেই। মাটির চুলা বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। এখন শুকনা বা রান্না করা খাবার দরকার। বৃহস্পতিবার ভোরে ঘরে পানি ঢোকার পর থেকে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারিনি।
এ দৃশ্য শুধু কাকরার নয়। উপজেলার সুরাজপুর- মানিকপুর, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। যেসব স্থানে গতকাল হাঁটুপানি ছিল, শুক্রবার সেখানে কোমরপানি দেখা গেছে।
পানি ওঠার কারণে গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। বরইতলী ইউনিয়নের ডেইঙ্গাকাটা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, পাঁচটি গরুই তাঁর একমাত্র সম্বল। পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় নৌকায় করে গরুগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা আশ্রয় নিয়েছেন পাশের একটি বাড়ির ছাদে।
বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জমান বলেন, ইউনিয়নের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কিছু মানুষ উঁচু স্থানে বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিলেও বেশির ভাগ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত শুকনা খাবার পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, উপজেলার শতাধিক গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় শুকনা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। লোকালয়ে পানি কিছুটা বাড়লেও মাতামুহুরী নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। নৌকাডুবির ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার অভিযান চালায়। কক্সবাজারে ডুবুরি দল না থাকায় চট্টগ্রাম থেকে আসা ডুবুরি দলের সহায়তায় পানিতে নিখোঁজ হাসনাতু জান্নাত নামে এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে।
একই অবস্থা রামু উপজেলার গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাওয়ারখোপ, মিঠাছড়ি ও ঈদগড়েও। এ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা এখন পানির নিচে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এমন পরিস্থিতিতে জেলার অন্তত ৬০ শতাংশই ডুবে গেছে বন্যার পানিতে। তলিয়ে গেছে মাইলের পর মাইল লোকালয়। চারদিকে থৈ থৈ করছে বন্যার পানি। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে উখিয়া, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, মহেশখালীসহ জেলার অর্ধশত ইউনিয়ন৷ এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কক্সবাজারের চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
রামু উপজেলার মিঠাছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা আবু হানিফ বলেন, বসতঘর ও রান্নাঘরে পানি থাকায় বৃহস্পতিবার ভোর থেকে রান্না করতে পারিনি। স্বজনরা নৌকা নিয়ে এসে কিছু শুকনো খাবার দিয়ে গেছেন। একই অবস্থা আশপাশের বসতিগুলোতেও।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান বলেন, রামু উপজেলার সবগুলো ইউনিয়ন পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনকে চাল, শুকনো খাবার ও নগদ টাকার সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলম সমকালকে বলেন, কক্সবাজারে পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য নগদ টাকা, চালসহ প্রয়োজনীয় অনুদান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম এবং পানিবন্দি লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসা হচ্ছে।