সিলেটে টিলাধস আতঙ্ক
সিলেট ব্যুরো
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
সিলেটে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পাশাপাশি ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যের পাহাড় থেকে নেমে আসছে ঢল। এ অবস্থায় জেলায় বন্যার সঙ্গে যে কোনো মুহূর্তে টিলা ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সিলেট জেলা প্রশাসন ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। চিহ্নিত করেছে ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা। এসব এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিপৎসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে সব কটি নদনদীর পানি।
গত বুধবার গোলাপগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মণাবন্দ পূর্বভাগ এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে ধসে পড়ে বিশাল টিলার অংশ। মাটি এসে আছড়ে পড়ে বসতঘরের ওপর। মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় ময়না মিয়ার ঘরের পেছনের অংশ। পরিবারের সদস্যরা অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও ঘরটি যে কোনো সময় সম্পূর্ণ ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।
গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে মাইকিং অব্যাহত আছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেট কার্যালয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন-চার দিন ভারতের মেঘালয়ে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। নেমে আসা এই পানি সিলেটের নদনদীর পানির স্তর আরও বাড়িয়ে দেবে, ফলে সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় দেখা দিতে পারে স্বল্পমেয়াদি বন্যা।
সিলেটে নদীর সব কটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে। তবে এখনও বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আজকালের মধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।
শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সিলেটের প্রধান নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, সুরমা নদী কানাইঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ১২ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটারের মধ্যে সকালে ১২.৪১ ও সন্ধ্যায় ১২.৪২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সুরমার সিলেট পয়েন্টে বিপৎসীমা ১০.৮০-এর মধ্যে সকালে ৯.৬৫ এবং সন্ধ্যায় ৯.৭০ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারার অমলশীদ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৫.৪০ এর মধ্যে সকালে ১৪.৫৬ ও সন্ধ্যায় ১৪. ৬০, একই নদীর শেওলা পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩.৫-এর মধ্যে সকালে ১২.৪ এবং সন্ধ্যায় ১২.১৫, বিপৎসীমা ১০.৪৫ এর মধ্যে সকালে ৯.৫২ ও সন্ধ্যায় ৯.৬০ এবং শেরপুর পয়েন্টে বিপৎসীমা ৮.৫৫-এর মধ্যে সকালে ৮.৩৮ ও সন্ধ্যায় ৮.৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। একইভাবে সিলেটের অন্যান্য নদীর পানিও বিপৎসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে।
পাউবো সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, উজানের পানি দ্রুত নেমে গেলে বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা কম।
সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় সব উপজেলার ইউএনওদের প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জেলায় ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। পর্যাপ্ত শুকনা খাবারও মজুত রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আখতার জানান, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সিলেটে টিলা ধসে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু অতিবৃষ্টি নয়, নির্বিচারে টিলা কাটার কারণেই এই ধসের ঝুঁকি বহু গুণ বেড়েছে। টিলা কাটা বন্ধে এখন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, নগরবাসীর সুরক্ষায় সিসিক পুরোপুরি প্রস্তুত। বৃষ্টির মধ্যেও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখতে মাঠে কাজ করছেন। আশ্রয়কেন্দ্র ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
- বিষয় :
- টিলা ধস