ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

এক সপ্তাহও টেকেনি ৬৫ লাখ টাকার সড়ক

এক সপ্তাহও টেকেনি  ৬৫ লাখ টাকার সড়ক
×

বগুড়া সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের মানিকচক বাজার থেকে কুটুরবাড়ী সড়কের কাজ শেষ হয়েছে সপ্তাহখানেক আগে। এরই মধ্যে হাতের টানে উঠে যাচ্ছে পিচ সমকাল

উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

সড়কের কার্পেটিং শেষ হয়েছে মাত্র এক সপ্তাহ আগে। এরই মধ্যে হাতের টানে উঠে আসছে পিচের আস্তরণ। পা দিয়ে সামান্য ঘষলেই ঝরে পড়ছে বিটুমিন ও পাথরের খোয়া। এ চিত্র বগুড়া সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের মানিকচক বাজার থেকে কুটুরবাড়ী সড়কের। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ৬৫ লাখ টাকা খরচে নির্মিত সড়কে কাদা ও ধুলাবালির ওপর নামমাত্র বিটুমিন স্প্রে করে তড়িঘড়ি করে কার্পেটিং করা হয়। এ কারণে সড়কটি এক সপ্তাহও টেকেনি। 

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বগুড়া কার্যালয়ের কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথি ঘেঁটে দেখা যায়, রাজশাহী বিভাগ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মানিকচক বাজার থেকে কুটুরবাড়ী পর্যন্ত প্রায় ৬৫০ মিটার সড়ক উন্নয়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৬৯ লাখ ৮ হাজার ৪৫৬ টাকা। দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নন্দীগ্রাম পৌরসভার দামগাড়া এলাকার ঠিকাদার আল মোমিনের প্রতিষ্ঠান মেসার্স অঙ্কন এন্টারপ্রাইজ ৬৫ লাখ ৬৩ হাজার ৩৩ টাকা চুক্তিমূল্যে কাজটি পায়। কার্যাদেশে প্রকল্পের কাজের মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ১৪ জুন পর্যন্ত। তবে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর সরকারি অর্থবছর শেষ হওয়ার ঠিক আগে, বর্ষার মধ্যে তড়িঘড়ি করে কার্পেটিং সম্পন্ন করা হয়। 
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, সময়ের চাপ সামলাতে গিয়ে কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়নি। সড়কের কয়েকটি অংশে খালি পায়েও হাঁটা যাচ্ছে না। গত রোববার সরেজমিন দেখা গেছে, সড়কের বিভিন্ন জায়গায় কার্পেটিংয়ের আস্তরণ আলগা হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও হাত দিয়ে টান দিলেই পিচ উঠে আসছে। অনেক জায়গায় পাথরের খোয়া ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। 
আব্দুল মালেক নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘বহু বছর কষ্ট করার পর একটা রাস্তা পেলাম। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেটা নষ্ট হয়ে গেল! আমরা টেকসই রাস্তা চেয়েছিলাম; লোক দেখানো কাজ নয়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, ‘কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি তাদের ভয়ভীতি দেখান। আমরা বলেছিলাম, কাজ ভালো হচ্ছে না। তখন হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে– বেশি কথা বললে পরে দেখে নেওয়া হবে।’

কার্যাদেশটি মেসার্স অঙ্কন এন্টারপ্রাইজের নামে হলেও তারা কাজ করেনি। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আল মোমিন বলেন, তিনি কাজটি বিক্রি করে দিয়েছেন। কিনেছেন বগুড়া জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাবতলী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম হেলাল। তবে জাহিদুল ইসলাম হেলালের দাবি, কাজটি তাঁর নামে নেওয়া হলেও তিনি করেননি। করেছেন তাঁর শ্যালক মোনারুল ইসলাম টুটুল। যদিও জানা গেছে, পুরো কাজেই হেলালের প্রতিনিধিরা মাঠে ছিলেন। তাঁকেও সশরীরে দুই-একবার কাজের সাইটে দেখা গেছে।
বিএনপি নেতা হেলাল এ প্রসঙ্গে বলেন, কাজের সময় এলজিইডির দুজন কার্যসহকারী, দুজন উপসহকারী প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকৌশলীসহ মোট পাঁচজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তাদের সামনেই কাজ হয়েছে। কার্পেটিংয়ের মসলা ডাম্প ট্রাকে আনা হয়েছিল। ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ নেই। কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দুই-এক জায়গায় পা দিয়ে বা অন্যভাবে খুঁচিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। কাজ শেষ হওয়ার পর থেকেই টানা বৃষ্টি হয়েছে। এখন আবহাওয়া ভালো হলে বিটুমিন গরম করে রোলার চালিয়ে প্রয়োজনীয় মেরামত করা হবে।
রাজাপুর ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক রেজা জানান, এলাকাবাসীর অভিযোগ পেয়ে সড়কটি পরিদর্শন করেছেন। পরে বিষয়টি বগুড়া সদরের ইউএনও, উপজেলা প্রকৌশলীকে জানান। ঠিকাদার আবহাওয়া অনুকূলে এলে সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছেন।

সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) সম্পাদক কেজিএম ফারুকের প্রশ্ন, বর্ষা মৌসুমে কেন এমন গুরুত্বপূর্ণ কার্পেটিংয়ের কাজ করা হলো? ভারী বৃষ্টির মধ্যে বিটুমিনভিত্তিক কার্পেটিং করলে তা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তারপরও সরকারি অর্থবছর শেষ হওয়ার ঠিক আগে জুন ক্লোজিংয়ের চাপ সামলাতে অনেক প্রকল্পে তড়িঘড়ি কাজ শেষ করার প্রবণতা রয়েছে। বগুড়ার এ সড়কেও সেই তাড়াহুড়োর প্রভাব পড়েছে। এখন শুধু ত্রুটিপূর্ণ অংশে মেরামত করলেই হবে না। কার্যাদেশ ও প্রাক্কলনের শর্ত অনুযায়ী পুরো কার্পেটিং তুলে নতুন করে নির্মাণ করতে হবে।
এলজিইডির সদর উপজেলা প্রকৌশলী মোবারক হোসেন বলেন, সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাসে এলজিইডি কার্পেটিংয়ের কাজ করে না। এবার জুনের শেষ দিকে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ঠিকাদারকে কাজের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কার্পেটিংয়ের পরদিন থেকেই টানা বৃষ্টি শুরু হয়। দুই পাশে গাছপালা থাকায় রাস্তা শুকানোর সুযোগ পায়নি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কাজে ত্রুটির প্রমাণ মিলেছে। আবহাওয়া অনুকূলে ঠিকাদার নিজস্ব খরচে ত্রুটিপূর্ণ অংশ মেরামত করবেন। তাঁর অভিযোগ, কিছু ব্যক্তি বৃষ্টির পর শাবল ও কোদাল দিয়ে রাস্তার অংশবিশেষ খুঁচিয়ে তুলেছেন। তবে এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।

আরও পড়ুন

×