নির্লজ্জ দলীয়করণ করে দুর্নীতিকে জাতীয়করণ করছে সরকার: জামায়াত আমির
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: ফাইল
সিলেট ব্যুরো
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ২০:১৮
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান বলেছেন, এখন যারা সরকার গঠন করেছেন তারাও একসময় মজলুম ছিলেন। কিন্তু তারা ভুলে গেছেন যে, সেই স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের পথ ধরেই তারা হাঁটা শুরু করেছেন। সমাজের সর্বক্ষেত্রে তারা বেপরোয়া, নির্লজ্জ দলীয়করণ করে দুর্নীতিকে জাতীয়করণ করতে চাচ্ছেন। আমরা এটা মানবো না। আমরা হাসিনা তাড়িয়েছি, আপনারা যদি ফ্যাসিবাদ কায়েম করেন, তবে জনগণ আপনাদেরকেও তাড়াবে।
জুলাই গণহত্যার বিচার, সংবিধান সংস্কার এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সিলেটের বিভাগীয় সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের সমাবেশে প্রধান অতিরি বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আজ শনিবার দুপুরে সিলেট নগরীর সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ (এবি) পার্টির মহাসচিব মো. আসাদুজ্জামান ভুঁইয়া ফুয়াদ, ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আব্দুল কাইয়ুম সুবহানী, খেলাফত আন্দোলনের আমির হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ কে এম আমজাদুল ইসলাম চানসহ ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা। সমাবেশকে কেন্দ্র করে সিলেটের চার জেলা থেকে ব্যাপক লোকসমাগম ঘটে।
সিলেটের আঞ্চলিক বঞ্চনা ও উন্নয়ন দাবি তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের মানুষ জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্বে লড়েছিলেন। কিন্তু সেই সিলেটের কিছু ন্যায্য দাবি যুগ যুগ ধরে ঝুলে আছে, বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে নামে মাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আছে, এখনো তা পূর্ণাঙ্গতা পায়নি। এই সমাবেশ থেকে দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে সিলেট এমএজি ওসমানী বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত করুন।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বেহাল অবস্থা তুলে ধরে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সমুদ্রের ঢেউ উপলব্ধি করার জন্য বঙ্গোপসাগরে যাওয়ার দরকার নেই, ঢাকা থেকে সিলেট আসলেই তা বোঝা যাবে।
সিলেটের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন প্রসঙ্গে ড. শফিকুর রহমান বলেন, সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, এখানে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় হবে। টেকনিক্যাল কলেজটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে কেন? এটাকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করে প্রাণ দেওয়া হোক। এছাড়া সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে না। অবিলম্বে এটাকেও পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হোক।
বর্তমান প্রশাসনের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সিলেটবাসীর আরও অনেক দাবি রয়েছে। আমরা জানি না আমরা কার কাছে এসব দাবি করছি। আর আদৌও তারা এসব দাবি বাস্তবায়ন করবে কিনা।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ ও গণভোটের দাবি তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, এই বিভাগীয় সমাবেশ আমাদের শেষ সমাবেশ। সারা বাংলাদেশ আমরা ঘুরেছি; সবখানের মানুষের একই দাবি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন আমরা সেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের বাস্তবায়ন দেখতে চাই।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা নাহিদ ইসলাম এবং শাইখুল হাদিস আল্লামা মামুনুল হক এই তিন নেতা এক হলে এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে উঠবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, তখন সরকার পালানোর কোনো পথ পাবে না।
কর্নেল অলি বলেন, এই তিন নেতা একজোট হলে তারা যেকোনো সময় ঢাকায় ২০ থেকে ৩০ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটাতে সক্ষম হবেন। টঙ্গী, যাত্রাবাড়ী ও মিরপুরের সড়ক একযোগে অবরোধ করে দিতে পারবেন। তখন আপনি কোন দিকে থাকবেন? আপনাকে এটা বুঝতে হবে। অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে দেশের মানুষের কথা চিন্তা করুন।
বর্তমান সরকারের নানা ব্যর্থতা ও অনিয়মের কঠোর সমালোচনা করে অলি আহমদ বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে এবং নিত্যপণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। আপনার দলের লোকেরা উল্টো দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানগুলো পাহারা দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে এলডিপিপ্রধান বলেন, একই ব্যক্তি একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন না—এই প্রস্তাব ১১ দলীয় ঐক্যজোটের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা গ্রহণ করা হয়নি। আপনি বিএনপির একক প্রধানমন্ত্রী না হয়ে গোটা দেশের মানুষের প্রধানমন্ত্রী হন।
জনগণের দাবি না মানলে আন্দোলনের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি আরও বলেন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন না ঘটলে ভবিষ্যতে এক দফা, এক দাবি এই সরকার কবে যাবি’ কর্মসূচি ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।
গণভোটের গণরায় অনুযায়ী, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার না করলে বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরের মেয়াদ সম্পূর্ণ করতে পারবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, এই সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে, আগামী পাঁচ বছরের মেয়াদ তারা সম্পূর্ণ করে যেতে পারবে না। তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি বলেন, তিনি কি পাঁচ বছর নির্বাচিতভাবে ক্ষমতায় থাকতে চান, নাকি শেখ হাসিনাসহ পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় জনগণের রায়কে উপেক্ষা করার যে করুণ পরিণতি হচ্ছে, সেই পরিণতি তিনি ভোগ করতে চান; সিদ্ধান্ত তারেক রহমানকেই নিতে হবে।
বক্তব্যের শুরুতে ভারতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে একজন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এই আন্দোলনকে সাধুবাদ জানান।
ঢাকায় গ্যাস সংকট এবং জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সিলিন্ডারের মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক বাজেটের মাধ্যমে মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা চাপানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সরকার সংস্কার না করায় অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও পাওয়া যাচ্ছে না।
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন অথবা বর্তমান কমিশনারদের পদত্যাগের দাবি জানান তিনি। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করছে, যার ফলে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রত্যাশিত উন্নতি সম্ভব হচ্ছে না।
জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার সরকারের থাকবে না বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে গাদ্দারি করবেন না। দোহাই লাগে। আপনাদের প্রথমে পায়ে ধরে বলবো, তারপরে হাতে ধরে বলবো। যদি পায়ে আর হাতে ধরে বললে কথা না শুনেন, ঘাড় ধরতে আমাদের এতটুকু হাত কাঁপবে না।
সরকারের উদ্দেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে মামুনুল হক বলেন, যেই জুলাই বিপ্লবের উপর ভিত্তি করে আপনারা ক্ষমতার মসনদে বসেছেন, সেই বিপ্লবের সঙ্গেই গাদ্দারি করছেন। এখনো বলছি, গণভোটের গণরায় মেনে নিন এবং জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করুন। জনগণ ভোটে যেভাবে ম্যান্ডেট দিয়েছে, সে অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করুন। অন্যথায় রাজপথে আপনাদেরকে আমরা মোকাবিলা করব।
গণভোটে জনগণের রায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে এর পরিণতি কেমন হতে পারে সে ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনের গণরায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা। পরিণামে তাদের মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়েছিল এবং বাংলার মানুষ স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল। আজ দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের এই ম্যান্ডেটের সঙ্গে যদি আপনারা বিশ্বাসঘাতকতা অব্যাহত রাখেন, তবে আপনাদের পরিণামও পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরগোষ্ঠী এবং শেখ হাসিনার চেয়ে ভিন্ন কিছু হবে না।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের চুপ্পু পদত্যাগ প্রসঙ্গে সরকারের ভূমিকা তুলে ধরে মামুনুল হক বলেন, আমরা শুরুতেই বলেছিলাম, শেখ হাসিনার ক্যাডার রাষ্ট্রপতির চেয়ারে থাকতে পারে না। আজ যখন সে রাষ্ট্রপতির মসনদে বসে আপনাদেরই ছোবল মারতে উদ্যত হয়েছে, তখন স্পিকারকে ২৪ ঘণ্টার নোটিশে হাসপাতাল থেকে ডেকে এনে সেই চুপ্পুকে আপনারা বিদায় করলেন!
- বিষয় :
- জামায়াতে ইসলামী
- সিলেট