ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কিশোরকে তুলে নিয়ে হত্যা, জানাজা শেষে অভিযুক্ত ইরানকে পিটিয়ে-কুপিয়ে হত্যা

কিশোরকে তুলে নিয়ে হত্যা, জানাজা শেষে অভিযুক্ত ইরানকে পিটিয়ে-কুপিয়ে হত্যা
×

প্রতীকী ছবি

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ১৬:৩৮ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ১৬:৫২

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে নাঈম (১৫) নামে এক কিশোরকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগে নুরুল ইসলাম ইরান (৫০) নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে উত্তেজিত জনতা। ইরানকে চিহ্নিত মাদক কারবারি বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। এ সময় তার বাড়িঘর ও মাদক সেবনের আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি ঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

শনিবার রাতে উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভাটেরখীল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ইরান ওই এলাকার নুরুল হকের ছেলে। পুলিশ বলছে, তার বিরুদ্ধে হত্যা ও মাদক আইনে চারটি মামলা রয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২০ জুলাই রাতে ইরানের কিছু ইয়াবা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় নাঈম ও ইমরান (২০) নামে দুইজনকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় ইরান ও তার সহযোগীরা। 

অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। নাঈমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে গুরুতর আহত অবস্থায় বাড়ির সামনে ফেলে রাখা হয়। আর ইমরানকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তার পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা হয়। পরে ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয় বলে পরিবারের দাবি।

গুরুতর আহত নাঈমকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার বিকেলে তাঁর মৃত্যু হয়।

নাঈমের জানাজা শনিবার বিকেল ৫টার দিকে অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, জানাজার পর মাইকে নাঈমের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ জানানো হয়। এ সময় ইরান কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে চার গ্রামের কয়েকশ মানুষ ইরানকে খুঁজতে বের হন। 

স্থানীয়দের দাবি, রাতে তাকে পাশের একটি বাড়ির গোয়ালঘর থেকে ধরে আনা হয়। রাত ১১টার দিকে উত্তেজিত জনতা তাকে গণপিটুনি দেয়। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।

পুলিশ জানায়, ইরানকে হত্যার পর তার বাড়িঘর ও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ থাকা কয়েকটি স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। রোববার দুপুরেও মুরাদপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে আলতাপ (৪৫) ও বাদশা (৫০) নামে দু’জনকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, তারা ইরানের সহযোগী। আলতাপকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আহত বাদশাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নিহত নাঈমের চাচা মো. ফারুক বলেন, ‘নাঈম দরিদ্র পরিবারের ছেলে। সে ভালো ছেলে ছিল। ইরানের ইয়াবা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তাকে ও ইমরানকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। নাঈমের নখ ও শরীরের চামড়া তুলে নেওয়া হয়।’

ইমরানের মা হাসিনা বেগম বলেন, ‘ইরানের লোকজন আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। অনেক অনুরোধ করেও তাকে ছাড়াতে পারিনি। পরে ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাকে ছাড়িয়ে আনি।’

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইমরান বলেন, ‘আমাকে বাড়ি থেকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয়। আমার সামনে নাঈমকে কুপিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। পরে আমার পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা হয়। ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার পর আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।’

নিহত ইরানের ছেলে রিফাত বলেন, তাঁদের ২২টি বসতঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘরের মালামাল লুটের পাশাপাশি একটি সিএনজি, দুটি পাওয়ারটিলার, একটি ভ্যান ও তিনটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা এ হামলা ও অগ্নিসংযোগে জড়িত।

তবে মুরাদপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. এজাহারুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ইরান দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে তাঁর সঙ্গে বিএনপির কোনো নেতা-কর্মীর সম্পৃক্ততা ছিল না।

সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, নাঈম হত্যার ঘটনায় শনিবার থানায় মামলা হয়েছে। পরে নাঈমের জানাজা শেষে উত্তেজিত এলাকাবাসী ইরানকে হত্যা করে। তাঁর বাড়িঘর ও মাদক কারবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ থাকা কয়েকটি স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, ইরান দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা ও মাদক আইনে চারটি মামলা রয়েছে। গত ৮ এপ্রিল সীতাকুণ্ড পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ শামীমকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হত্যার ঘটনাতেও ইরানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।

আরও পড়ুন

×