রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
মারধরের শিকাররাই গ্রেপ্তার, ‘মবের’ তদন্ত দাবি
গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর, রাকসু ভবন ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। ছবি-সমকাল
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ১৫:৩৯ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ১৫:৪৭
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) ও ছাত্র শিবির নেতাদের মারধরের শিকার তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে দুইজনকে নিষিদ্ধ ‘ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের’ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গতকাল সোমবার রাতে নগরের শাহ মখদুম থানা পুলিশের একটি মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এদিকে গতকালের ঘটনাকে ‘মব ভায়োলেন্স’ অ্যাখ্যা দিয়ে বিচারের দাবি জানিয়েছে ক্যাম্পাসের ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা। এ ঘটনার সার্বিক বিষয়ে তদন্ত করতে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
গ্রেপ্তাররা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আনাস এবং মাহমুদুল হাসান।
বিষয়টি নিশ্চিত করে মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান সমকালকে বলেন, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে আগের করা একটি মামলায় ওই দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তারা দুইজন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিলে উপস্থিতি তদন্তে প্রাপ্ত আসামি বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে তারা দুজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এর আগে গত রোববার সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তাকে ভয়ভীতি দেখানো ও ক্যাম্পাস ছাড়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে একই বিভাগের শিক্ষার্থী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় গত রোববার রাতে ওই ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পর প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান তাঁর কার্যালয়ে অভিযুক্তদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে মহসিন আলমের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস, হাসিব এবং সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসান। অভিযোগ অস্বীকারের একপর্যায়ে তাঁরা প্রক্টরের সঙ্গে উচ্চবাচ্যে জড়িয়ে পড়েন।
সোমবার দুপুরে বিষয়টি নিয়ে প্রক্টর দপ্তরে আবার বৈঠক হয়। বৈঠকে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজন নেতা আনাসকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী বলে অভিযোগ করেন। এ সময় তার মুঠোফোনে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে তাকে মারধর করা হয়। পরে বিষয়টি সাময়িকভাবে মীমাংসা করে সবাইকে প্রক্টর দপ্তর থেকে বের করে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: গ্রন্থাগারে ঢুকে শিক্ষার্থীদের মারধর করলেন রাকসু ও শিবির নেতারা
এরপর ওই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে রাকসু কার্যালয়ে গিয়ে রাকসু নেতাদের ওপরে হামলার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার পরে তারা রাকসু ভবন থেকে ধাওয়া খেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে অবস্থান নেন। পরে তাদের ওপরে রাকসু ও শাখা শিবিরের নেতারা হামলা করেন এবং কয়েক দফায় মারধর করেন। এই ঘটনায় আনাস ও মাহমুদুলকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হলে উপাচার্যের দপ্তর ঘেরাও করে অবস্থান নেয় শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ দিকে শিবিরের এই মারধরকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আখ্যা দিয়ে পাল্টা অবস্থান নিয়ে শিবিরের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
তদন্তে কমিটি গঠন
এ দিকে গতকালের ঘটনা ও নারীঘটিত বিষয়টি তদন্ত করতে মঙ্গলবার একটি ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কমিটিকে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা করতে ১০ কর্ম দিবসের সময় দেওয়া হয়েছে। পরে দুপুর সাড়ে ১২টায় গঠিত তদন্ত কমিটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষ পরিদর্শন করে।
প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম-২ কে আহ্বায়ক করে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছাদিক, ম্যাটেরিয়ালস্ সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আসাদুল হক, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলাম এবং ফলিত রসায়ন ও রসায়ন প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এ নাঈম ফারুকী।
বন্ধ রয়েছে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের একটি পাঠাগার
এ দিকে গতকালের ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ওই পাঠ কক্ষটি বন্ধ রাখা হয়েছে। পাঠাগারটিতে ভোর থেকে নিয়মিত পড়াশোনা করেন চাকরি প্রত্যাশী সাবেক ও বর্তমান অর্ধশত শিক্ষার্থী। তবে গতকালের ঘটনার পর তারা আজ গ্রন্থাগারে এসেও ফেরত গিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিনের মতো আজ সকালে গ্রন্থাগারের পাঠাগারের ফটকে ব্যাগ দিয়ে সিরিয়াল দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। তবে ফটকটি না খোলার সিদ্ধান্ত জেনে কেউ পাশের পাঠাগারে, আবার কেউ দোতলার ডিসকাশন কক্ষে পড়াশোনা করেন।
‘মব ভায়োলেন্স’ আখ্যা দিয়ে বিচার দাবি ছাত্র সংগঠনগুলোর
রাকসু ও শিবির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রক্টরের কার্যালয় এবং কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ঢুকে মারধরের ঘটনাকে ‘মব ভায়োলেন্স’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ ও সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছে ক্যাম্পাসের ছাত্রসংগঠনগুলোর মোর্চা গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট। একইসঙ্গে ছাত্রলীগ কর্তৃক রাকসু ভবনে হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল রাতে ছাত্র মঞ্চের আহ্বায়ক নাসিম সরকার প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে তাঁরা এ দাবি জানান। এ ছাড়াও ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির দাবি করেছেন শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
মারধরের ঘটনায় রাকসু ও শিবিরের নেতাদের বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় সংগঠনটির সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘লাইব্রেরি এবং বিশ্ববিদ্যালয় হলো শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ জায়গা। অথচ সেখানেই শিবিরে সন্ত্রাসীরা আজ হামলা করেছে। সেই হামলায় আবার তারাই ‘গুপ্ত শিবির’ যারা আগে ছাত্রলীগ করত, তাদের সঙ্গে নিয়ে হামলা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব প্রক্টরের, অথচ সেই প্রক্টর দপ্তরেই তাদের উপর প্রথমে হামলা করা হয়েছে। যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দোষী প্রত্যেককে শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে এভাবে ‘মব’ করে কোনো মোনাফেক সংগঠন কোনো শিক্ষার্থীর জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে।
গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ছাত্রলীগ কর্তৃক রাকসু ভবনে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রক্টরের উপস্থিতিতে তিন ব্যক্তিকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ওই ব্যক্তিদের আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি না করে, পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ স্থান কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে যেভাবে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে পেটানো হয়েছে, তা কোনো সুস্থ ও গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাসের চিত্র হতে পারে না। এই বর্বরোচিত ঘটনার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পড়াশোনার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।
কোনো অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার কোনো ছাত্র সংগঠনের নেই উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে শিক্ষার্থীরা যে স্বাধীন ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের স্বপ্ন দেখেছিল, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই সংস্কৃতি সেই আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।
এ ঘটনায় তারা দুইটি দাবি জানিয়েছেন- ১. ছাত্রলীগ কর্তৃক রাকসু ভবনে হামলার তদন্ত ও বিচার একইসাথে মব ভায়োলেন্সের সাথে জড়িত রাকসু ও শিবিরের দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, ২. সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিসহ পুরো ক্যাম্পাসে পড়াশোনার স্বাভাবিক ও ভীত্তিহীন পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।