ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দখল

সন্ধ্যা নদীর তীরে একের পর এক পাকা স্থাপনা

বানারীপাড়ায় ১ একর ৮৮ শতাংশ খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায়

সন্ধ্যা নদীর তীরে একের পর এক পাকা স্থাপনা
×

বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীর তীরে জমি দখল করে নির্মিত হচ্ছে স্থাপনা। সম্প্রতি তোলা- সমকাল

 সুমন চৌধুরী, বরিশাল ব্যুরো 

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৯ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ১২:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশালের বানারীপাড়া শহরে সন্ধ্যা নদীর তীরে খাসজমির ১ একর ৮৮ শতাংশ ব্যক্তিমালিকানায় নামজারি (রেকর্ড) হয়েছে। ওই জমি রাতারাতি বিক্রয় সূত্রে হাতবদল হয়েছে। এখন পাকা ভবনসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ চলছে। দখল করা জমির মূল্য কয়েক কোটি টাকা। দখলের শুরুতেই স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে লিখিত অভিযোগ দেন। তবে রহস্যজনক কারণে প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। 

অভিযোগ উঠেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বানারীপাড়া সদর ইউনিয়নের তৎকালীন উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা (তহশিলদার) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার যোগসাজশে এ দুর্নীতি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হিন্দু সম্প্রদায়ের মৃত ব্যক্তিদের নামে মালিকানা দেখিয়ে তাদের ওয়ারিশদের মাধ্যমে জমি বেচাকেনা হয়।  গান্ধী লাল দে নামে এক ওয়ারিশের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, জমির প্রকৃত মালিক প্রয়াত নরেন্দ্রনাথ ঘোষের ছেলে অবিবাহিত শচীন্দ্রনাথ ঘোষ। তাঁর লোকান্তরে ভাগনে প্রয়াত গান্ধী লাল সাড়ে ২০ শতাংশ জমির একমাত্র ওয়ারিশ। এ ছাড়া প্রয়াত জিতেন কর্মকারের নামে ২০ শতাংশ এবং আরও কয়েকজন মৃত ব্যক্তিকে মালিক দেখানো হয়। এর সঙ্গে খাসজমিও দখল করা হয়েছে। 

মৃত ব্যক্তিদের নামে রেকর্ডভুক্ত হওয়ায় তাদের ওয়ারিশদের কাছ থেকে দলিল নেন প্রভাবশালীরা। পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত বানারীপাড়া উপজেলা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় কয়েকজনসহ বিভিন্ন স্তরের নেতারা। তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার জন্য কৌশলী ভূমিকা নেন। নিজেদের নামে দলিল নেননি। কথিত ওয়ারিশদের কাছ থেকে সরাসরি ক্রেতাকে দলিল দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী হয়ে টাকা নিয়েছেন। কয়েকজন ক্রেতা সেখানে একতলা থেকে দুইতলা পাকা ভবন নির্মাণ করছেন। অন্যরা কাঠের স্থাপনা করে দখলে নিয়েছেন। 

তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, শুধু এক একর ৮৮ শতাংশ নয়; ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নদীর তীরে ১১ একর খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হয়েছে।  
গত রোববার সরেজমিন দেখা যায়. শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডে বন্দর বাজার লাগোয়া নদীর তীরে বালু ভরাট করে পাকা ও আধাপাকা অনেক স্থাপনার নির্মাণ কাজ চলছে। যেখানে বালু ফেলা হয়নি, সেখানে কাঠের মাচা দিয়ে স্থাপনা করা হয়। সেগুলোতে বিভিন্ন ধরনের রেস্তোরাঁ করা হয়েছে। 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বিএনপির কর্মী মনির হোসেনের দ্বিতল ভবনের নির্মাণ প্রায় শেষ হয়েছে। পাশেই একতলা ভবন নির্মাণ করছেন পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল আলম রিপন, উপজেলা জাকের পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান দিপু মাঝি ও ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম। 

মনির হোসেন জানান, তিনি গান্ধী লালের ওয়ারিশদের কাছ থেকে জমি কিনেছেন। গান্ধী কীভাবে মালিক হয়েছেন, তিনি জানেন না। এ জমি খাস হয়ে থাকলে সরকার যেন মামলা করে তাদের উচ্ছেদ করে। 
জমির আরেক ক্রেতা পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল আলম রিপন জানান, তিনি শচীনের ওয়ারিশ অরুণ চন্দ্র গংয়ের কাছ থেকে জমি কিনেছেন। ওটা খাসজমি নয়। 
খাসজমি ব্যক্তির নামে রেকর্ড হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ যারা দিয়েছেন তাদের একজন শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ইদ্রিস মল্লিক। সোমবার রাতে তিনি সমকালকে বলেন, দরখাস্ত দিয়ে খুব চাপে আছেন। স্ত্রী, ছেলেমেয়েসহ সবাইকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। মনে হয়, দেশের মধ্যে এরাই বড় ভূমিদস্যু। অভিযোগ দেওয়ায় ইউএনও তাঁর দপ্তরে ডেকে নিয়ে শাসিয়েছেন।

পদে পদে জালিয়াতি 
ভূমি অফিস থেকে জানা যায়, বানারীপাড়া উপজেলাধীন বানারীপাড়া মৌজার তিনটি খতিয়ানের জমি ১৯৬৮ সাল থেকে খাস খতিয়ানভুক্ত। অভিযোগ উঠেছে, এসব জমির মধ্যে মোট ১ একর ৮৮ শতাংস জমি বিভিন্ন নামে মালিকানার রেকর্ড করিয়ে দেন সহকারী কমিশনারের (ভূমি) দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজিদুর রহমান। 
গান্ধী লালকে সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নের মাদারকাঠী গ্রামের মৃত শচীন্দ্রনাথ ঘোষের একমাত্র ওয়ারিশ শনাক্ত করে নোটারি পাবলিক করেন একজন অ্যাডভোকেট। সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আ. জলিল খান নোটারি পাবলিকের ভিত্তিতে গত বছর জুনে শচীন্দ্রনাথের ভাগনে পরিচয়ে গান্ধী লালকে ওয়ারিশ সনদ দেন। সেই সনদের ভিত্তিতে ইউনিয়র উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা গান্ধীর নামে রেকর্ড সংশোধনের সুপারিশ সহকারী কমিশনারে কাছে পাঠান। 

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট মাসুদ হাওলাদার সমকালকে বলেন, ওয়ারিশ শনাক্তের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর তথ্য গ্রাম পুলিশ তদন্ত করবে। গ্রাম পুলিশের তদন্তের সত্যতা যাচাই করবেন স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার। তাঁর মতামতের ওপর ভিত্তি করে চেয়ারম্যান ওয়ারিশ সনদ দেবেন। ইউনিয়ন পরিষদ সনদ দিতে ব্যর্থ হলে পর্যায়ক্রমে ইউএনও এবং জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা যাবে। এ ক্ষেত্রে কোনো আইনজীবীর নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ওয়ারিশ শনাক্ত করা এবং তার ওপর ভিত্তি করে চেয়ারম্যানের সনদ দেওয়ার বৈধতা নেই।  
এ প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আ. জলিল জানান, গান্ধী লাল নামে কাউকে তিনি চেনেন না। সনদ নিতে আসার পর প্রথমে ফিরিয়ে দেন। ওয়ারিশ শনাক্তের নোটারি পাবলিক নিয়ে আসার পর সেটার কথা উল্লেখ করে সনদ দিয়েছেন। নোটারি পাবলিকের ভিত্তিতে সনদ দেওয়া যায়না– এ আইন তাঁর জানা নেই। 

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বানারীপাড়া সদর ইউনিয়নের সাবেক তহশিলদার ওবায়দুর রহমান এবং ইউএনও মো. বায়েজিদুর রহমানের মোবাইল ফোনে রোববার ও সোমবার একাধিকবার কল দিলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, গত বছর রেকর্ড করার সময় সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন ইউএনও বায়েজিদ। ওবায়েদুর বর্তমানে ভোলা জেলায় কর্মরত। 

ফোন করার কারণ উল্লেখ করে সোমবার সন্ধ্যায় ইউএনওর হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দেওয়া হয়। রাত ১০টার দিকে নাঈম মোঘল নামে স্থানীয় এক সংবাদকর্মী সমকাল প্রতিনিধিকে ফোন দিয়ে ইউএনওর পক্ষে সাফাই গান। ইউএনও তাঁর পাশে আছেন বলে জানান। নাঈমের ফোন দিয়ে ইউএনও বলেন, খাসজমি ব্যক্তির নামে রেকর্ডের অভিযোগ সঠিক নয়। এক ব্যক্তি এ সংক্রান্ত অভিযোগ দেওয়ার পর তদন্তে এটি নিষ্পত্তি হয়েছে। তা ছাড়া জমি রেকর্ডের আগে বিষয়টি তহশিল অফিস থেকে যাবতীয় প্রস্তুত করে পাঠানো হয়। সহকারী কমিশনার শুধু অনুমোদন দেন।
 

আরও পড়ুন

×