ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দখল

বরিশালে সরকারি পুকুর ভরাট

২০ দিন ধরে বালু ফেলে ভরাট

বরিশালে সরকারি পুকুর ভরাট
×

বরিশাল নগরীর ভাটিখানা এলাকায় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পেছনে প্রায় ৬৯ শতাংশ খাসজমি জাল কাগজ তৈরি করে দখলে নিয়েছে ভূমিদস্যুরা। সেখানে জলাশয় ভরাট করে চলছে প্লট তৈরির কাজ। গতকাল বৃহস্পতিবার তোলা -সমকাল

 সুমন চৌধুরী, বরিশাল

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:২৪ | আপডেট: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশাল নগরীতে বালু ফেলে একটি পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, ওই পুকুর সরকারি খাসজমিতে। জালিয়াতি করে পুকুরটি ব্যক্তি মালিকানার দাবি করা হচ্ছে। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে পুকুরটি ভরাট করছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের পেছনে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা রয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

শহরের বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম লিয়ন, ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব বাবুল তালুকদার, স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলমগীর ও রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পুকুরটি ভরাট করা হচ্ছে। 
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লিয়ন ভাঙাড়ির ব্যবসা করেন। তবে এক যুবদল নেতার সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠ। একই ওয়ার্ডের বাসিন্দা মহানগর বিএনপির একজন নেতাও তাদের পেছনে রয়েছেন। খাসজমিটি দখলে নিতে তারা একজোট হয়েছেন।

জানতে চাইলে লিয়ন বলেন, ‘ওয়ারিশ সূত্রে ওই জমির মালিক হেলাল আকন ও তাঁর বোন। আমরা চারজন পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে ওই জায়গা বালু ফেলে ভরাট করছি। পরে প্লট আকারে বিক্রির পরিকল্পনা আছে।’ তিনি আরও বলেন, জমির মালিকানা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ভুয়া। 
বালু ভরাটকারী ঠিকাদার মো. জুয়েল বলেন, সাত লাখ টাকার চুক্তিতে তিনি জায়গাটি ভরাট করছেন। 

৬৯ শতাংশের পুকুরটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। পুকুরটির পাশেই বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও উদ্বোধনের জন্য অপেক্ষমাণ ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল। বক্ষব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুকুরটি দখলের বিষয়ে স্থানীয় থানাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোতে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। কিন্তু ২০ দিন ধরে চলা ভরাট বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। 
বীণাপাণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে উত্তরমুখী সড়কে মুন্সীবাড়ি ওই এলাকায় পরিচিত। মুন্সীবাড়ির সামনের পুকুরটি দখল করে ভরাট করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ ভরাট হয়ে গেছে। বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ভবনের পেছনে হওয়ায় মূল সড়ক থেকে পুকুরটি দেখা যায় না। 

মুন্সীবাড়ির প্রবীণ বাসিন্দা মাহবুবুর রহমানের ভাষ্যমতে, ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা জানতেন, পুকুরটি বক্ষব্যাধি হাসপাতালের। কয়েক দিন আগে শুনেছেন, কারা নাকি কিনেছেন।  
বক্ষব্যাধি হাসপাতালের অফিস সহকারীর দায়িত্বে থাকা ফার্মাসিস্ট আনোয়ারা বেগম সমকালকে জানান, হাসপাতালের সাত একর ৪১ শতাংশ জমির পর্চা রয়েছে। এর দাগ নম্বর ১০৬৯ (ভিটা), ১০৭০ (পুকুর), ১০৭১ (পুকুর)। পর্চায় উল্লেখ রয়েছে, এই জমির মালিক বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কালেক্টর। তিনি বলেন, ‘আমরা কাউনিয়া থানায়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে ঘুরেছি। কিন্তু জমিটি বেহাত হওয়া ঠেকাতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। পুকুরটি ভরাট বন্ধ করা হচ্ছে না।’ 

হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা মাসুমা আক্তার বলেন, পুরোনো কর্মচারীরা সবাই জানেন এটি সরকারি জমি। জলাশয়টি রাতের আঁধারে ভরাট করা হচ্ছে। গত ১৯ জুলাই কাউনিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। সিভিল সার্জন, এসিল্যান্ড ও জেলা প্রশাসকের দপ্তরকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এসিল্যান্ড জানিয়েছিলেন, তারা ওই জমির চারপাশে বেড়া দিয়ে দেবেন। কিন্তু সোমবার রাতে গাছপালা কেটে দখলদাররাই বেড়া দিয়েছে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা ঘুরে দেখে গেলেও কোনো ব্যবস্থা নেননি। 

পুকুরটি দখল ও ভরাটের নেপথ্যে বিএনপির নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক বলেন, এ ঘটনায় বিএনপির কোনো নেতা জড়িত নন। আর কাগজপত্র জাল-জালিয়াতি হয়েছে কিনা, তা ভূমি অফিস দেখবে। 

সদর উপজেলার এসিল্যান্ড আজহারুল ইসলাম জানান, বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পাশের পুকুরটি খাস খতিয়ানের জমি। প্রায় ১৫ বছর আগে জরিপে বিএস রেকর্ডে এটি ব্যক্তি মালিকানার দেখানো হয়। এ ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের লেনদেন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একটি চক্র পুকুরটি দখলে নিয়েছে। খাসজমি তাদের কাছে কী করে গেল, তা চ্যালেঞ্জ করতে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে তিনি মামলা করবেন।  
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক (বিসিসি) বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের উদাসীনতা রয়েছে। মামলা করে জমি উদ্ধার করতে দীর্ঘ বছর লাগবে। সরকারি সম্পত্তি বেহাত ঠেকাতে তাঁর যা যা করার দরকার, তিনি করবেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার সমকালকে বলেন, তিনি বিষয়টি জানেন না। তবে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। 

আরও পড়ুন

×