গোপন রেজিস্টারে বাল্যবিবাহ
ছবি: সমকাল ইপেপার
কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাল্যবিবাহ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ কারণে আইনকে পাশ কাটাতে নওগাঁয় অনেক ম্যারিজ রেজিস্ট্রার (কাজি) প্রতারণার আশ্রয় নেন। সরকারি নিবন্ধনের বাইরে গোপন রেজিস্টারে নাবালক-নাবালিকাদের বিয়ে লিপিবদ্ধ করেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে কিছু কাজি এমন বিয়ের তথ্য আলাদা খাতায় সংরক্ষণ করেন। পরে পাত্র-পাত্রী সাবালক হলে তাদের নিকাহনামা দেওয়া হয়। এ ধরনের জালিয়াতির ফলে বিয়ে হওয়া কিশোরীরা প্রয়োজন হলেও আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
অনুসন্ধানে নওগাঁর বিভিন্ন উপজেলায় এমন একাধিক অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। মান্দা উপজেলার একটি পরিবার ২০২৩ সালে সপ্তম শ্রেণিপড়ুয়া মেয়েকে বিয়ে দেয়। বাল্যবিবাহ বলে সেটি গোপন রাখতে অন্য একটি ইউনিয়নের কাজির মাধ্যমে বিয়ে নিবন্ধন করা হয়। গত তিন বছরেও তারা নিবন্ধনের নকল পাননি। পরিবারটির অভিযোগ, মেয়ের বিয়ের পর নানা অজুহাতে পাত্রপক্ষ প্রায় ১০ লাখ টাকা নিয়েছে। পরে টাকা ফেরত চাইলে মেয়েকে মারধর করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আইনি প্রতিকার চাইতে গেলে বিয়ে নিবন্ধনের নকল প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেটি তারা সংগ্রহ করতে পারেননি। ফলে আদালতে বিয়ের প্রমাণ উপস্থাপন করাও যায়নি। এক পর্যায়ে নাবালিকা অবস্থাতেই মেয়েটিকে অন্যত্র বিয়ে দিতে বাধ্য হয় পরিবারটি। এ ধরনের বিপত্তির কথা প্রায়ই শোনা গেলেও পরিবারগুলো নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চায় না।
একই উপজেলার চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর ২০২৪ সালে বিয়ে হয়। ১৩ বছর বয়সী মেয়েটির বর্তমানে তিন মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। এই বিয়ের তথ্যও লেখা হয় গোপন রেজিস্টারে।
বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী নারীর বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ এবং পুরুষের ২১ বছর। মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন বইয়ের বাইরে কোনো খাতায় বিয়ে লিপিবদ্ধ করার সুযোগ নেই। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনেক অভিভাবক বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে আইনি বাধা এড়াতে শুধু ইমাম বা মৌলভীর মাধ্যমে আক্দ্ সম্পন্ন করেন। এতে কোনো সরকারি নিবন্ধন হয় না। এমন গোপন বাল্যবিবাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দম্পতির কেউ না কেউ এখনও বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। এসব দম্পতির মধ্যে যারা পরবর্তী সময়ে বিয়ে বিচ্ছেদ বা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে, তাদের অনেকেই আইনি সহায়তার আশ্রয় নিতে পারেনি। অনেকে স্থানীয়ভাবে সালিশ-মীমাংসার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করেছে।
নওগাঁর ৯৯টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভায় ১২০ জন মুসলিম এবং ১৬ জন হিন্দু ম্যারিজ রেজিস্ট্রার রয়েছেন। গত জানুয়ারি থেকে জুন– এই ছয় মাসে জেলায় চার হাজার ৩৯৬টি বিয়ে এবং দুই হাজার ৫৮৪টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। সরকারিভাবে ডিজিটাল বিয়ে নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ থাকলেও জেলার কোথাও কার্যকর হয়নি।
অনুসন্ধানে মহাদেবপুর, মান্দা, আত্রাই ও রাণীনগর উপজেলার কয়েকজন কাজির বিরুদ্ধে বাল্যবিবাহ নিবন্ধন ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে যোগাযোগ করলে অভিযোগ অস্বীকার করেন তারা। তবে নাবালক মেয়ের অভিভাবক পরিচয় দিলে তাদের কয়েকজন বিয়ে নিবন্ধন বিষয়ে সম্মতি দেন।
মহাদেবপুরের সফাপুর ইউনিয়নের কাজি আমিনুল ইসলাম বলেন, যে বিয়ের নকল (নিকাহনামা) দিলে মামলার ঝুঁকি থাকে, সেসব বিয়ের নকল দিই না। উকিলের মাধ্যমে নোটারি বা এফিডেভিট করে সেই কপি দেওয়া হয়। ছেলে বা মেয়ের পরিবার অনুরোধ করায় এমন বিয়ের তথ্য আলাদা রেজিস্টারে লিখে রাখি। মেয়ে সাবালিকা হলে পরিবেশ বুঝে নকল দেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ১০ থেকে ১২টি গোপন রেজিস্টারে বাল্যবিয়ে নিবন্ধনের তথ্য মিলেছে। মান্দার পরানপুর ইউনিয়নের কাজী আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ১২ থেকে ১৪টি নাবালিকা মেয়ের বিয়ে নিবন্ধনের অভিযোগ রয়েছে। এ উপজেলার মৈনম ইউনিয়নের কাজি মোসাদ্দেক হোসেন সুলতান বলেন, আপনারা শুধু আমাদেরই দেখতে পাচ্ছেন? আমাদের মতো আরও অসংখ্য কাজি একই কাজ করছেন।
রাণীনগরের কাশিমপুর ইউনিয়নের নিবন্ধিত কাজি বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে জেলার বিভিন্ন স্থান, বিশেষ করে নওগাঁ আদালত চত্বরে নাবালক-নাবালিকা ও পালিয়ে যাওয়া যুগলের বিয়ে নিবন্ধনের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফোন করলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি সংযোগ কেটে দেন। বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১৮ থেকে ২০টি নাবালিকা মেয়ের বিয়ে গোপন নথিতে নিবন্ধনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে অনুসন্ধানে কথা বলা একাধিক পরিবার, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, অনিয়মে জড়িত কাজির সংখ্যা বা এমন বিয়ের ঘটনা অনেক বেশি হতে পারে। এ বিষয়ে নওগাঁ জজ আদালতের আইনজীবী মহসিন রেজা বলেন বলেন, কাবিননামা না থাকলেও পারিবারিক সহিংসতার শিকার কিশোরীরা মামলা করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বিয়ের সম্পর্ক প্রমাণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিয়ের ছবি বা ভিডিও, কাজির রেজিস্টারের তথ্য, সাক্ষীর বক্তব্য, একসঙ্গে বসবাসের প্রমাণসহ অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য আদালতে বিবেচিত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, গোপন রেজিস্টারে বিয়ে নিবন্ধন কিংবা কাবিনের কপি না দেওয়া মূলত ওই কিশোরীর ভবিষ্যৎ আইনগত অধিকারকে ঝুঁকিতে ফেলে। পরে ভরণপোষণ, দেনমোহর, পারিবারিক সহিংসতা বা অন্য কোনো আইনি প্রতিকার চাইতে গেলে বিয়ের অস্তিত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে তাকে অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে।
সমাজকর্মী নাইস আক্তার বলেন, গোপনে বাল্যবিবাহ নিবন্ধনের সুযোগ তৈরি হলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিশোরীরা। এটি শুধু আইন লঙ্ঘন নয়; তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভবিষ্যতের ওপরও বড় আঘাত।
নওগাঁ জেলা কাজি সমিতির সভাপতি কাজী এমএম আমিনুল ইসলাম বলেন, কয়েকজনের অনিয়মের কারণে পুরো পেশার বদনাম হচ্ছে। বাল্যবিবাহের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আত্রাইয়ে বিশা ইউনিয়নের কাজি আব্দুর রাজ্জাক এবং রাণীনগরের কাজি বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে জেলা রেজিস্ট্রার বরাবর আবেদন করা হয়েছে।
জেলা রেজিস্ট্রার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, কাজি আব্দুর রাজ্জাক ও বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আব্দুর রাজ্জাক কারাগারে আছেন।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বাল্যবিবাহ ও অবৈধ নিবন্ধনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- বাল্যবিবাহ