বাদুড়ের ‘বাড়ি’
হালুয়াঘাট উপজেলার জয়রামকুড়া মিলন বাজারের পাশে বাঁশঝাড়ে নিরাপদ আবাস বেঁধেছে হাজারো বাদুড়। ছবিটি সম্প্রতি তোলা সমকাল
রফিকুল্লাহ চৌধুরী মানিক, হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ)
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
দিনের আলোয় বাঁশঝাড়টি নীরব। বাঁশের কঞ্চিতে সারি সারি ঝুলে থাকে কালচে রঙের বাদুড়। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন অদ্ভূত সব ফল ঝুলছে। তবে সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। দলবেঁধে বাদুড়গুলো উড়ে যায় খাবারের সন্ধানে। ভোরের আলো ফোটার আগেই আবার ফিরে আসে বাঁশঝাড়ে। এমন চিত্র হালুয়াঘাটের জয়রামকুড়া মিলন বাজারের পাশের বাঁশঝাড়ের। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে টিকে আছে বাদুড়ের আবাসটি। এটি অনেকের কাছে বাদুড়ের ‘বাড়ি’ নামেও পরিচিত।
স্থানীয়দের ধারণা, এখানে সহস্রাধিক বাদুড়ের আনাগোনা রয়েছে। গ্রামবাসীর কাছে এখন আর বিরক্তির কারণ নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রতিবেশী।
হালুয়াঘাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে জয়রামকুড়া মিলন বাজার। বাজার পেরিয়ে ৫০ মিটার উত্তর পাশে চোখে পড়ে প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত বাঁশঝাড়। মুসলিম ও গারো সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাসের এই শান্ত জনপদেই গড়ে উঠেছে বাদুড়গুলোর নিরাপদ আশ্রয়।
বাঁশের কঞ্চিতে হুকের মতো পা আটকে মাথা নিচু করে ঝুলে থাকে বাদুড়গুলো। মানুষের উপস্থিতি কিংবা সামান্য শব্দ পেলেই ডানা মেলে উড়ে যায়। সন্ধ্যার পর তাদের কিচিরমিচির ও ডানার শব্দে মুখর হয়ে ওঠে আশপাশের এলাকা।
বাঁশঝাড়ের মালিক বিজয় রিছিল মারা যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী নীলিমা নকরেক ও মেয়ে লুনা নকরেক বাদুড়গুলো দেখে রাখছেন।
জানতে চাইলে নীলিমা নকরেক বলেন, ১০ বছর ধরে বাদুড়গুলো এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। এর আগে আসা-যাওয়া করত। কোনো সময় চলে গেলে এক-দুই বছর পর্যন্ত দেখা মিলত না। আগে কিছু মানুষ বিরক্ত করত। বলার পর এখন তেমন বিরক্ত করে না।
লুনা নকরেক জানান, তাঁর বাবার মতো মাও বাদুড়গুলোকে ভালোবাসেন। বাদুড়গুলোর দেখভাল করেন তারা। দিনে এখানে থাকে, রাতে খাবারের সন্ধানে চলে যায়। বাদুড়গুলো রক্ষা করার দায়িত্ব সবার।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা জুলহাস বলেন, প্রায় ৪০-৫০ বছর ধরে এই বাঁশঝাড়ে বাদুড়ের আনাগোনা দেখে আসছেন তিনি। আগের তুলনায় এখন বাদুড়ের সংখ্যা কিছুটা কমেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাদুড়গুলোর টিকে থাকার পেছনে রয়েছে মানুষের সহনশীলতা ও নিরাপদ পরিবেশ। বাঁশঝাড়টি নিরিবিলি হওয়ায় বাদুড়গুলো নির্বিঘ্নে সেখানে থাকতে পারে। আশপাশে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফলদ গাছ। ফলে খাবারেরও তেমন সংকট হয় না।
সন্ধ্যা নামলেই খাবারের সন্ধানে বাদুড়গুলো দলবেঁধে দূরদূরান্তে উড়ে যায়। রাতভর খাবার খুঁজে ভোর হওয়ার আগেই আবার ফিরে আসে বাঁশঝাড়ে। তখন তাদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ ও ডাকাডাকিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।
এই নিরাপদ আশ্রয়ও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। মৌসুমি ফল রক্ষায় কেউ কেউ লিচু, আম ও বরই গাছের চারপাশে জাল পেতে রাখেন। এসব জালে পাখির পাশাপাশি বাদুড়ও আটকা পড়ে মারা যায়। কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারও বাদুড়ের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
স্থানীয় কবি পরাগ রিছিলের ভাষ্য, বাদুড়কে অনেকেই ভয় পান বা ক্ষতিকর প্রাণী মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন ফল ও উদ্ভিদের বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে ফসল রক্ষায়ও ভূমিকা রাখে বাদুড়। তাই এই প্রাণী সংরক্ষণে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
- বিষয় :
- পাখি