ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান ট্রাক সহকারী মতিউর

সীতাকুণ্ডে এলএনজি জাহাজে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু

অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান ট্রাক সহকারী মতিউর
×

প্রতীকী ছবি

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১০:২৩

সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল ২০ বছর বয়সী মতিউর রহমান সাজ্জাদের। প্রতিদিনের মতো কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন তিনি। ট্রাকের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসের ঘটনায় অন্যদের উদ্ধারে এগিয়ে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।

শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে এলএনজি স্ক্র্যাপ জাহাজে গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের উদ্ধারে স্থানীয় লোকজন ও শ্রমিকেরা যখন ছুটছিলেন, তখন মতিউরও এগিয়ে যান। বিষাক্ত গ্যাসের মধ্যে ঢুকে পড়ায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।

পরে তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম নগরের ন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুপুরের দিকে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতালের চিকিৎসক মাহমুদ হাসান বলেন, জুমার নামাজের ঠিক আগে সীতাকুণ্ড থেকে তিনজন রোগীকে হাসপাতালে আনা হয়। তাদের মধ্যে একজনকে জরুরি বিভাগে এবং একজনকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। মতিউর রহমান নামের একজনের মৃত্যু হয়।

মতিউরের বাড়ি সীতাকুণ্ডের দক্ষিণ সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ফুলতলা গ্রামে। তার বাবা মো. হানিফ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। কোনো কাজ করতে পারেন না। তিন মেয়ে ও এক ছেলের সংসারে অভাব-অনটন ছিল। বড় মেয়ে বুলবুলি আক্তার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। মেজ মেয়ে শারমিন আক্তারের বিয়ে হয়েছে কুমিরা এলাকায়। ছোট মেয়ে শান্তা আক্তার গামারিতলা মোস্তফা হাকিম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

বাবার অসুস্থতা ও প্রতিবন্ধী বোনের কারণে অল্প বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেন মতিউর। তিন বছর ধরে বার আউলিয়ার ফুলতলা এলাকায় একটি অক্সিজেন প্ল্যান্টে কাজ করছিলেন তিনি।

মতিউরের বাবা হানিফ বলেন, তার ছেলে ওই জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে কাজ করতেন না। ইয়ার্ডের মালিকের অক্সিজেন প্ল্যান্টে কাজ করতেন। ঘটনার দিন সকাল নয়টার দিকে অক্সিজেনের বোতল নিয়ে ভাটিয়ারীর ওই ইয়ার্ডে গিয়েছিলেন। সেখানে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার পর শ্রমিকদের উদ্ধারে ছুটে যান।

হানিফ বলেন, ‘সকালে শুনলাম, সাজ্জাদ জাহাজের শ্রমিকদের বাঁচাতে গিয়ে মারা গেছে। এ খবর শুনে মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী ঘুরছে। কোনো দিন ভাবিনি ছেলে এত তাড়াতাড়ি আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে যাবে। আমি অসুস্থ বাবা হয়ে কীভাবে এই ঘটনা সহ্য করি?’

ছেলেকে হারানোর শোক এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না হানিফ। তার ভাষায়, ‘এখনো মনে হচ্ছে ছেলে বেঁচে আছে। ঘরে এলেই সব সময় শুধু মাকে জিজ্ঞেস করত, বাবা কী খেয়েছে?’ মৃত্যুর দিন সকালে মেজ বোনকে মতিউর বলেছিলেন, কাজ থেকে ফিরে তাকে শ্বশুরবাড়িতে দিয়ে আসবেন। কিন্তু সেই কথা আর রাখা হলো না।

২০ বছরের তরুণটির মরদেহই শেষ পর্যন্ত ফিরেছে শীতলপুরের বাড়িতে। অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়ে যাওয়া মতিউরের মৃত্যুতে এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
 

আরও পড়ুন

×