নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি
‘তৌহিদী জনতা’ নামে কারা প্রচারণা চালাচ্ছে- খতিয়ে দেখা হচ্ছে: ইউএনও
ফাইল ছবি
বিয়ানীবাজার (সিলেট) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ২১:০৪ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ২১:২৩
সিলেটের বিয়ানীবাজারে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে ‘তৌহিদী জনতা’র নামে প্রচারণা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন সতর্ক হয়েছে। কারা ‘তৌহিদী জনতা’র নামে প্রচারণা চালাচ্ছে এবং এর উদ্দেশ্য কী, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার।
ইউএনও বলেন, নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির সঙ্গে ধর্মীয় কোনো বিষয় জড়িত কিনা, সেটিও প্রশাসন জানার চেষ্টা করছে। তবে এখন পর্যন্ত জানা গেছে- নৌকাবাইচের বিরোধিতাকারীদের মূল আপত্তি চলাচলে অসুবিধা, কৃষিজমি নষ্ট, ফসলহানি ও নদীভাঙন নিয়ে।
তিনি বলেন, বিষয়টি স্থানীয়ভাবে দেখার জন্য লাউতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নৌকাবাইচের পক্ষে বা বিপক্ষের কেউই প্রশাসনের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি।
এর আগে শুক্রবার দিবাগত রাতে দৈনিক সমকালে বিয়ানীবাজারে নৌকাবাইচ বন্ধ করার দাবি ‘তৌহিদী জনতার’- শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও বিশিষ্টজনদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে শনিবার রাতে স্থানীয় বারইগ্রাম বাজারে নৌকাবাইচের পক্ষ-বিপক্ষের লোকজনকে নিয়ে বৈঠক করেন ইউপি চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
সোনাই নদীতে লাউতা ও বাহাদুরপুর যুবসমাজের উদ্যোগে আগামী ২৮ আগস্ট নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা রয়েছে। এ আয়োজন বন্ধের দাবিতে কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চলছে। ‘তৌহিদী জনতা’র নামে একটি পোস্টারও ফেসবুকে প্রকাশ করা হয়। পরে অবশ্য পোস্টারটি সরিয়ে নেন এর প্রচারকারী যুবক মাসুম বিন নুর উদ্দিন।
মাসুম বিন নুর উদ্দিন বলেন, স্থানীয় মুরব্বি, মাওলানা ও ব্যবসায়ীদের অনুরোধে তিনি পোস্টারটি ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলেন। শনিবার দুপুরে সেটি সরিয়ে নিয়েছেন।
নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সোনাই নদীতে নৌকাবাইচ হলে এলাকার ক্ষতি হয়, কৃষকদের ফসলহানি হয় এবং নদীপাড়ের বাসিন্দারা ভাঙনের শিকার হন। এসব কারণেই তারা নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
তবে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতি বা ঈমানি দায়িত্ববোধের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা- জানতে চাইলে মাসুম বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না। মাওলানা আব্দুল হক, হাফিজ শিব্বির আহমদ ও স্থানীয় ব্যবসায়ী হোসেন আহমদ তাকে পোস্টারটি প্রকাশ করতে অনুরোধ করেছিলেন বলে জানান তিনি।

‘নৌকাবাইচ বন্ধ করা ঈমানী দায়িত্ব’
বড়লেখার হাটবন্দ এলাকার এফ আর মহী সুন্না মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মো. আব্দুল হক নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে অনড় থাকার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, নৌকাবাইচসহ প্রতিযোগিতায় পুরস্কার দেওয়া হলে তা জুয়ার পর্যায়ে পড়ে এবং ইসলাম তা নিষেধ করেছে। এটি বন্ধ করা সবার ঈমানী দায়িত্ব।
এ ছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নৌকাবাইচ আয়োজন করলে চলাচলে অসুবিধা হয়, কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নদীভাঙন বাড়ে বলে দাবি করেন তিনি। তার অভিযোগ, নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে এলাকায় জুয়া ও মাদকের উপদ্রবও বাড়তে পারে।
আব্দুল হক বলেন, শনিবার জোহরের নামাজের পর বারইগ্রাম বাজারে সভা করে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিযোগিতা বন্ধের জন্য মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধ করা হয়েছে। প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ারও প্রস্তুতি চলছে।
তার দাবি, গত বৃহস্পতিবার বারইগ্রাম মসজিদে সভা করে নৌকাবাইচের প্রতিবাদ করা হয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিভিন্ন মসজিদেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নুর উদ্দিনকে ‘তৌহিদী জনতা’র নামে প্রচারণা চালাতে তারাই অনুরোধ করেছিলেন বলেও জানান মাওলানা আব্দুল হক।

আয়োজকদের দাবি, নৌকাবাইচ সংস্কৃতির অংশ
নৌকাবাইচ আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা হেলাল উদ্দিন বলেন, নৌকাবাইচ আবহমান বাংলার সংস্কৃতির অংশ। এর সঙ্গে ধর্মীয় কোনো বিধিনিষেধ নেই। অতীতেও তারা শান্তিপূর্ণভাবে নৌকাবাইচ আয়োজন করেছেন এবং স্থানীয় মানুষ এতে অংশ নিয়ে আনন্দ উপভোগ করেছেন।
তিনি বলেন, গত কয়েক দিন ধরে এলাকার কয়েকজন যুবক নৌকাবাইচের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে তারা আয়োজকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করেননি। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই তারা নৌকাবাইচ আয়োজন করেন।
হেলাল উদ্দিন আশা করেন, স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় বিষয়টির সমাধান হবে। বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন, সাবেক চেয়ারম্যান গৌছ উদ্দিন ও মোল্লাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিষয়টি দেখছেন বলে জানান তিনি।