দিনে বন্ধের নোটিশ, রাতে গোপনে কবুল
ছবি: সমকাল ইপেপার
কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৯ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিয়ের সব আয়োজন শেষ। বাড়িতে অতিথি, রান্নাবান্না চলছে, বরপক্ষও চলে এসেছে। লাল শাড়িতে কনেকে সাজানো হয়েছে। ঠিক তখনই খবর পেয়ে হাজির প্রশাসন ও পুলিশ। ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিয়ে বন্ধ, কনের অভিভাবককে জরিমানা, নেওয়া হলো মুচলেকা ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হবে না।
নওগাঁর আত্রাইয়ে গত মাসের এই ঘটনাটি প্রশাসনের খাতায় একটি ‘প্রতিরোধ করা বাল্যবিবাহ’। কিন্তু বিয়ের আসর ভেঙে দেওয়ার পর মেয়েটির কী হলো, তার খোঁজ কী রাখা হয়েছে? পরিবারটি পরে আর বিয়ের আয়োজন করেনি তো? মেয়েটি স্কুলে ফিরেছে কিনা? এমনকি কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে তার বিয়ে দেওয়া হয়েছে কিনা–এসব প্রশ্নের উত্তর নেই প্রশাসনিক সাফল্যের হিসাবেও।
সব এলাকায় ঝুঁকি একরকম নয়
সব এলাকায় বাল্যবিবাহের ঝুঁকি একরকম নয়। সীমান্তবর্তী ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলোতে দারিদ্র্য, স্কুল থেকে ঝরে পড়া, নিরাপত্তাহীনতা এবং সচেতনতার অভাবকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে সচেতন মহল। সাপাহার, পোরশা, পত্নীতলা, ধামইরহাট, নিয়ামতপুর ও মান্দার দুর্গম গ্রামীণ এলাকায় বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।
এসব এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাল্যবিবাহ বন্ধে তাৎক্ষণিক অভিযান থাকলেও বন্ধ হওয়া বিয়েগুলোর দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির ব্যবস্থা কার্যত দুর্বল। ফলে দিনের আলোয় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বিয়ের আয়োজন পণ্ড হলেও সুযোগ বুঝে রাতে, অন্য এলাকায় কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী এক অভিভাবক বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেট জরিমানা করে যাওয়ার পর গ্রামে মুখ দেখানো দায় হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া মেয়েকে একা রাখার নিরাপত্তাও ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে কাজি ছাড়া গোপনে পাশের উপজেলার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি।’
দিনে অভিযান, রাতে আয়োজন
নওগাঁর বিভিন্ন উপজেলায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ হটলাইন ১০৯-এ খবর পেয়ে প্রশাসন ও পুলিশ নিয়মিত বাল্যবিবাহ বন্ধ করছে। কোনো কোনো ঘটনায় জরিমানা করা হচ্ছে, কোথাও অভিভাবকের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও কারাদণ্ডও দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে ধামইরহাটে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গণপতি রায়ের হস্তক্ষেপে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বাল্যবিবাহের হাত থেকে রক্ষা পায়। ওই ঘটনায় তিনজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মান্দার একটি গ্রামেও সপ্তম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থীর বিয়ের আয়োজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নির্দেশে গ্রাম পুলিশ ও ইউপি সদস্য গিয়ে বন্ধ করেন।
মান্দা উপজেলার গণেশপুর ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বাবুল বলেন, ‘ইউপি সদস্য ও গ্রাম পুলিশ পাঠিয়ে খবর পাওয়া মাত্রই অনেক বিয়ে বন্ধ করি। কিন্তু প্রশাসনিক দল চলে যাওয়ার পর বা আমরা এলাকা ছাড়লে পরিবারগুলো অনেক সময় মেয়েকে আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে রাতের আঁধারে বিয়ে দেয়।’ তিনি বলেন, ‘সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে এবং বিয়ের পর নজরদারি না থাকলে স্রেফ এক দিনের অভিযানে বাল্যবিবাহ ঠেকানো অসম্ভব।’
‘বিয়ে বন্ধ’–তারপর আর কোনো খোঁজ নেই
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখানেই। প্রশাসনের কাছে ‘কতটি বিয়ে বন্ধ হয়েছে’–তার হিসাব থাকে। কিন্তু ‘বন্ধ করার পর কতটি মেয়ে ১৮ বছর পর্যন্ত নিরাপদে থাকল’–তার হিসাব নেই। একটি উপজেলা প্রশাসন বছরে ৫০টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করলে তাদের মধ্যে কতজন আবার বিয়ের চেষ্টা করেছে কিংবা কতজন স্কুলে ফিরেছে–এসব তথ্য আলাদাভাবে শনাক্ত করা হয় না।
অনুসন্ধানে এমনই তথ্য মিলেছে। প্রশাসনের দল চলে যাওয়ার পর অনেক পরিবার সাময়িকভাবে বিয়ের আয়োজন স্থগিত রাখে। পরে সুযোগ বুঝে অন্য গ্রামে, আত্মীয়ের বাড়িতে কিংবা রাতের আঁধারে বিয়ের আয়োজন করে। কোথাও আবার কাজি এড়িয়ে মৌলভি ডেকে ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে পড়ানোর কথাও জানা গেছে।
নওগাঁয় স্থানীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা (এনজিও) ‘মৌসুমী’-এর তথ্য মতে, গত তিন বছরে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় মোট ৫০টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে অধিকাংশ পরিবারই সুযোগ বুঝে আবারও তাদের কমবয়সী সন্তানদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন।
সংস্থাটি আরও জানায়, প্রশাসনের তৎপরতা সত্ত্বেও বাল্যবিবাহ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে, তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ রাণীনগর উপজেলা। সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরাসরি হস্তক্ষেপে একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয় এবং মেয়েটির লেখাপড়ার সমস্ত খরচ ও দায়িত্ব নেন ওই কর্মকর্তা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তিনি বদলি হয়ে যাওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পরিবারটি মেয়েটিকে আবাও বিয়ে দিয়ে দেয়।
মাঠপর্যায়ের এই বাস্তবতার বিষয়ে সংস্থাটির হিউম্যান রাইটস মনিটরিং অফিসার নাইস পারভীন বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়ায় হয়তো এক ঘণ্টার জন্য কোনো বিয়ের আসর পণ্ড করা সম্ভব। পরিবার যখন মেয়েকে বোঝা বা নিরাপত্তার ঝুঁকি মনে করে, তখন তারা সুযোগ পেলেই আবার বিয়ে দিয়ে দেয়। তাই কেবল ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; মেয়েটির আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে হবে।’
রেজিস্ট্রি এড়িয়ে গোপন বিয়ে
জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে জেলায় ২৬ হাজার ৩৭৬টি বিয়ে এবং ২ হাজার ৫৮৪টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। এই নিবন্ধিত বিয়ের বাইরে কতটি বিয়ে হয়েছে, তার কোনো সরকারি হিসাব নেই। গত তিন বছরে জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর ৬০টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করেছে। প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। তবে এই পরিবারগুলোর মধ্যে কতটি পরিবার পুনরায় বাল্যবিবাহ দিয়েছে বা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, সেই তথ্য জেলা কার্যালয়ে সংরক্ষিত নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাল্যবিবাহ রোধে সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনা খাতুন বলেন, অভিযান-পরবর্তী তথ্য বা ফলোআপের তথ্য ও পরিসংখ্যান মূলত সংশ্লিষ্ট উপজেলা কার্যালয়ে সংরক্ষণ করার কথা। উপজেলা পর্যায় থেকে এসব তথ্য নিয়মিত আপডেট রাখা হয়েছে কিনা, তা এই মুহূর্তে আমার জানা নেই।’
বাল্যবিবাহ ঠেকাতে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি থাকায় নতুন করে আরেকটি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে–কাজি এড়িয়ে অনিবন্ধিত বিয়ে। প্রশাসনের অভিযানের মুখে পড়া কোনো কোনো পরিবার জরিমানা বা শাস্তির ঝুঁকি এড়াতে বিয়ে নিবন্ধন না করেই ধর্মীয় রীতি মেনে বিয়ে সম্পন্ন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বয়স যাচাইয়ের অন্যতম প্রধান দলিল জন্মনিবন্ধন সনদ জালিয়াতিও করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক কনের বয়স ১৮ বছর দেখাতে কোথাও পুরোনো কাগজপত্রে ঘষামাজা, আবার কোথাও অন্যের সনদ ব্যবহার করে বিয়ের আয়োজন করা হয়। তবে এসব প্রমাণ বের করা বেশ কঠিন।
নওগাঁর মানবাধিকার কর্মী প্রকৌশলী চন্দন কুমার দেব বলেন, সরকারি নথিতে বিয়ের অস্তিত্ব না থাকলে সামাজিকভাবে মেয়েটি হয়ে যায় বাল্যবধূ। পরবর্তী সময়ে স্বামী অস্বীকার করলে, যৌতুকের নির্যাতন হলে কিংবা ভরণপোষণ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে প্রমাণ না থাকায় মেয়েটিই সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে।
জেলা রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলাম বলেন, ভুয়া কাগজপত্র বা বয়স কমিয়ে বিয়ে রেজিস্ট্রি করলে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সম্প্রতি গোপন রেজিস্টারে বিয়ে নিবন্ধনসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে আত্রাইয়ের বিশা ইউনিয়নের কাজি আব্দুর রাজ্জাক এবং রানীনগরের কাজি বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কাজি আব্দুর রাজ্জাক গ্রেপ্তার হয়ে হাজতবাস করছেন।
জেলা কাজি সমিতির সভাপতি এম এম আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘কড়া নজরদারির কারণে এখন নিবন্ধিত কোনো কাজি অপ্রাপ্তবয়স্ক কারও বিয়ে রেজিস্ট্রি করার সাহস পান না। তবে অভিযান চালিয়ে বিয়ে বন্ধ করার পর অভিভাবকেরা বিয়ে রেজিস্ট্রি না করেই মৌলভি ডেকে গোপনে কাজ সারছেন।
পোরশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্তবর্তী ও প্রত্যন্ত এলাকায় দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাবের কারণে বাল্যবিবাহের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। খবর পাওয়া মাত্রই আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিয়ে বন্ধ করি। কিন্তু একটি বিয়ে বন্ধ করার পর সেই পরিবারের ওপর একটানা নজর রাখা অত্যন্ত কঠিন।’
অভিযানের পরও নজরদারি জরুরি
মানবাধিকারকর্মীসহ সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু বিয়ে বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি বন্ধ হওয়া বিয়েকে একটি ‘ফলোআপ কেস’ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অন্তত ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত মেয়েটির শিক্ষা, নিরাপত্তা ও পরিবারের অবস্থার ওপর নজর রাখা গেলে পুনরায় বিয়ের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
প্রথম মাস, তৃতীয় মাস, ষষ্ঠ মাস এবং মেয়েটির ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় শিক্ষক, ইউপি সদস্য, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ও সমাজসেবা কর্মকর্তার সমন্বয়ে নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বাল্যবিবাহ বন্ধে তাৎক্ষণিক অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অবশ্যই প্রাথমিক সাফল্য। তবে এটিই শেষ কথা নয়। বিয়ের আসর পণ্ড করার পর শিশুটি পুনরায় ঝুঁকিতে পড়ছে কিনা, তা নিয়মিত মনিটর করা গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘রেজিস্ট্রি ছাড়া গোপন বিয়ে এবং ভুয়া জন্মসনদ তৈরির বিরুদ্ধে পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে।’
সাফল্য মাপতে হবে মেয়েটির স্কুলে ফেরায়
বাল্যবিবাহ বন্ধের প্রকৃত সাফল্য কতটি অভিযান হলো, কত টাকা জরিমানা আদায় হলো কিংবা কতজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হলো–শুধু এসব সংখ্যায় মাপা যায় না। সাফল্য তখনই, যখন বিয়ের আসর থেকে ফিরিয়ে আনা মেয়েটি আবার স্কুলে যেতে পারে; যখন পরিবার আর বিয়ের আয়োজন করে না; যখন ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত তার শৈশব নিরাপদ থাকে।
মান্দা উপজেলার কাঞ্চন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজী মোজাম্মেল হক বলেন, নওগাঁর গ্রামগুলোতে দিনের আলোয় বন্ধ হওয়া বিয়ে যেন রাতের আঁধারে আবার না বসে–এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, প্রশাসন এক দিনের জন্য বিয়ের আসর ভাঙতে পারে, কিন্তু একটি মেয়ের শৈশব রক্ষা করতে হলে সেই পরিবারের দরজায় পরের দিন, পরের মাস এবং পরের বছরও নজর রাখতে হবে।