ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ১০ মৃত্যু

‘ছেলে হারানোর ক্ষতি কি কখনো পূরণ হবে?’

‘ছেলে হারানোর ক্ষতি কি কখনো পূরণ হবে?’
×

ফাইল ছবি

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ২১:০৪

‘ক্ষতিপূরণের ১০ লাখ টাকা পেলাম। কিন্তু ছেলে হারিয়ে যে ক্ষতি আমার হয়েছে তা কি আর কখনো পূরণ হবে? ক্ষতিপূরণের টাকায় হয়তো ছয় মাস–এক বছর চলতে পারব। কিন্তু হারানো ছেলেকে তো ফিরে পাব না।’ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে মারা যাওয়া সানি জলদাসের মা আশকা দাশ কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই কথাগুলো বলেন।

১৪ আগস্ট সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজের সিলিন্ডারের বিষাক্ত গ্যাসে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। গতকাল রোববার বিকেলে মৃত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণের চেক দেওয়া হয়। ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

একই ঘটনায় মৃত পলাশ জলদাসের মা শোভা রানী দাশ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘পুত্রবধূ সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ছেলেকে তো আর পাব না। তার সন্তান পৃথিবীতে এলে এই টাকা তার পেছনেই খরচ করব। এটুকুই আমার সান্ত্বনা।’

গতকাল জাহাজভাঙা কারখানার মালিক পৃথকভাবে ১০ লাখ এবং দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আরও ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এর আগে ঘটনার দিন নিহত প্রত্যেকের পরিবারের সদস্যদের কাছে নগদ এক লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে শ্রম আদালতে সরকারি বিধি মোতাবেক দুই লাখ টাকা করে জমা দেয় কারখানা কর্তৃপক্ষ।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘যারা আহত–নিহত হয়েছেন তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমাদের নেই। শিপব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে যেমন আছে, সরকারও তেমনি পাশে আছে। প্রাথমিকভাবে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আগামীতে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব সুযোগ-সুবিধা আসবে আমরা তা যথাসময়ে দিয়ে দেব।’

জেলা প্রশাসক বলেন, এই জাহাজ শিল্প গড়ে ওঠার কারণে ৫০ হাজারের অধিক শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে তা ইয়ার্ড মালিকদের সমন্বয়ে সংশোধন করা হবে।

বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ‘এ রকম দুর্ঘটনা আর যাতে না হয় সে জন্য কনসালটেন্সি ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে। কাটার আগেই তারা জাহাজ ঝুঁকিমুক্ত করবে। এতে কারখানা কর্তৃপক্ষের ব্যয় বাড়লেও দুর্ঘটনা কমবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি। আগের মালিককেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জানানো হয়েছে। ইয়ার্ড মালিকের কোনো গাফিলতি আছে কি না, তা বিএসবিআরএ গঠিত তদন্ত টিম খতিয়ে দেখছে।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহাবুবুল হক, ইউএনও মো. ফখরুল ইসলাম, ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং কারখানার মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ প্রমুখ।

যারা চেক নিলেন
পাবনার সুজানগরের নিহত আবদুল আলিম সুজনের স্ত্রী সুবানা আক্তার, জামালপুরের ইসলামপুরের হাবিবুর রহমানের স্ত্রী রুনা আক্তার, সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর মো. মসছুরের স্ত্রী ফেরদৌস আরা, মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের খোকন মিয়ার বাবা রানা মিয়া, একই জেলার সদর থানার রানা মিয়ার বাবা মো. হারুন মিয়া, ভাটিয়ারীর পলাশ দাশের স্ত্রী ভূমিকা দাশ, মতিউর রহমানের মা নুর খাতুন, সানি জলদাসের মা আশকা দাশ ও জামালপুরের কুমারিয়া শ্রীপুর এলাকার ইদ্রিছ আলীর স্ত্রী বানি বেগম ক্ষতিপূরণের চেক গ্রহণ করেন।

এক সপ্তাহ লাইফ সাপোর্টে থেকে মৃত্যু
সীতাকুণ্ডে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে আহত মো. আলাউদ্দিন (৫২) নামে এক শ্রমিক মারা গেছেন। গতকাল রোববার সকালে চট্টগ্রাম নগরীর প্রবর্তক মোড়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

মৃত আলাউদ্দিনের পরিবার জানায়, ওই হাসপাতালে সপ্তাহখানেক ধরে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন তিনি। গত ১৬ আগস্ট সকালে উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের শীতলপুর চৌধুরী ঘাটায় বারাকা গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি।

আলাউদ্দিন কুমিরা ইউনিয়নের মগপুকুর এলাকার মো. নুরুল ইসলামের ছেলে। তাঁর ভাই কামাল উদ্দিন বলেন, জাহাজ কাটার সময় আলাউদ্দিন নিচে পড়ে যান। এতে বুক, ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুরুতর আঘাত পান। সহকর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রামে নিয়ে যান।

কামাল উদ্দিন জানান, আলাউদ্দিনের দুই ছেলে। তাদের মধ্যে রাকিবুল ইসলাম সপ্তম শ্রেণিতে ও আদিলুল ইসলাম রায়য়ান চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মর্গে নিয়ে গেছে। হস্তান্তরের পর জানাজা শেষে বাড়িতেই দাফনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি মহিনুল ইসলাম বলেন, এক সপ্তাহ আগে পুরোনো জাহাজে কাজ করার সময় আলাউদ্দিন আহত হয়েছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। 

আরও পড়ুন

×