ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জুয়া আর মাদকের ছড়াছড়ি অপরাধে জড়াচ্ছে তরুণরা

জুয়া আর মাদকের ছড়াছড়ি অপরাধে জড়াচ্ছে তরুণরা
×

সাদুল্লাপুর (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

জুয়ায় টাকা হেরে আত্মহত্যা করেছেন জোবেদ আলী নামের এক অটোচালক। গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের দশলিয়া গ্রামের বাসিন্দা তিনি। পরিবারের দাবি তিনি জুয়ায় আসক্ত ছিলেন। এতে নিঃস্ব হয়ে গেল ১৮ জুলাই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। 

সাদুল্লাপুরে জুয়া ও মাদকের কারবার  চলছে প্রকাশ্যে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্ত পদক্ষেপ না নেওয়ায় দিন দিন জুয়াড়ি ও মাদকাসক্তের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে উপজেলার সচেতনমহল। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাদুল্লাপুরের ছোট-বড় হাট-বাজারের চা-স্টলগুলোতে বসে অনলাইন জুয়ার আসর। সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এসব আসর। এ ছাড়াও সন্ধ্যার পর থেকে বসে ‘ফরগুটি’র জুয়া। উপজেলার নলডাঙ্গা ব্রিজ-সংলগ্ন জামুডাঙ্গা গ্রাম, মহেশপুর গ্রাম, মীরপুর এলাকা, ভাজাকালাই, কালসারডারা বাজার এলাকায় জুয়ার আসর বসে বলে। 
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতার সুযোগে জুয়া আর মাদকের আসর চলছে নির্বিঘ্নে। এসবে টাকা খুইয়ে অপরাধে জড়াচ্ছে আসক্তরা। 
ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের বগুড়ার শেরপুর এলাকা থেকে ৭ আগস্ট রাতে ২৯টি গরুসহ একটি ট্রাক ডাকাতি হয়। পরে সেই গরু ও ট্রাকের সন্ধান মেলে সাদুল্লাপুর উপজেলার মীরপুর এলাকায়। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১৫টি গরু উদ্ধারসহ দুইজনকে আটক করে। থানার ওসি একেএম হাবিবুল ইসলাম বলেন, যেহেতু গরু ও ট্রাক এখান থেকে উদ্ধার হয়েছে, তাই এই ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের বড় একটি অংশ স্থানীয় হতে পারে। 

এসব অপরাধ কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সিঁচকেচুরি এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে অহরহ। 
সম্প্রতি সাদুল্লাপুর বাজার মোড়ে (থানার সন্নিকটে) একটি মিষ্টান্ন দোকানে গভীর রাতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। দোকান মালিক আবু তালেব মিয়া বলেন, সিসিটিভির ফুটেজে চোর শনাক্ত হলেও, খোয়া যাওয়া দেড় লক্ষাধিক টাকা উদ্ধার হয়নি। 
তাঁর পাশেই ব্যবসায়ী আনোয়ারুল ইসলামের মোবাইল ফোন চুরি হয়েছে গত সপ্তাহে। এর সঙ্গে মোটরবাইক, বাইসাইকেল, ছাগল, ও মোবাইল চুরি বেড়ে যাওয়ায় শঙ্কিত উপজেলার বাসিন্দারা। সাদুল্লাপুর থানায় প্রায়ই এমন চুরির অভিযোগ আসে বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা। 

ধাপেরহাটের আখিরা ফ্যাসান হাউসের মালিক আমিনুল ইসলাম বলেন, এই এলাকা থেকে সম্প্রতি দুটি মোটরসাইকেল চুরি হয়েছে। এর সঙ্গে হাটবারে মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনতাইয়ের খবর পাওয়া যায়। ধাপেরহাট বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুর মোহাম্মদ মিলন সমকালকে বলেন,  জুয়া আর মাদকে আসক্তরাই এসব চুরি-ছিনতাইয়ের সঙ্গে বেশি জড়িত। এসব বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। 

সম্প্রতি মাদকাসক্তদের হাতে রংপুরে শিক্ষক পরিবারের সবাইকে হত্যার ঘটনায় ভাবিয়ে তুলেছে বলে দাবি করেন সাদুল্লাপুর সরকারি কেএম পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোস্তাফিজার রহমান ফারুক। তিনি বলেন, ‘মাদক আর জুয়া বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে এমন অপরাধ বাড়তেই থাকবে।’
উপজেলার ভাতগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহফুজার রহমান জানান, এলাকা থেকে জুয়া ও মাদকের কারবার বন্ধে তিনি অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাতে সফলতা পাননি। এমনকি পুলিশকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন। জুয়া ও মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় বিভিন্ন মহল থেকে হুমকি-ধমকি পেয়েছেন। 
স্কুল শিক্ষক ও সাবেক ইউপি সদস্য সাইদুর বলেন এখানে অনেক স্থানেই জুয়া বসে। তাতে অনেক পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। এর প্রভাবে অপরাধ বাড়ছে। কিন্তু এসব বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি। 
কৃষক সমিতির উপজেলা সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সমাজকে অবক্ষয়ের কবল থেকে রক্ষা করতে হলে জুয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে হবে। সামাজিক প্রতিরোধের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর পদক্ষেপ নিলে সুফল মিলবে।’

সাদুল্লাপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সামছুল হাসান বলেন, জুয়া আর মাদকের কারবার বন্ধের জন্য থানার ওসিকে জানানো হয়েছে। গত জুলাই মাসের আইনশৃঙ্খলা সভায় এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সম্প্রতি এখানে কর্মীসভায় আসা জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মহিলা এমপি মমতাজ আলোর উপস্থিতিতে মাদক ও জুয়া বন্ধের জন্য প্রশাসনকে জরুরি পদক্ষেপ নিতে বলেছেন জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিকও। 
এ বিষয়ে সাদুল্লাপুর থানার ওসি একেএম হাবিবুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ করে রাতে বসা ‘ফরগুটি’র জুয়া বন্ধের জন্য পুলিশি অভিযান অব্যাহত আছে। গত সপ্তাহে উপজেলায় জুয়া পরিচালনার অন্যতম হোতা শুভজিত সরকার শিবুকে আটক করেছে ডিবি পুলিশ। তিনি জানান, নিজ থেকে সচেতন না হলে সব ধরনের জুয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়। যেমন- ‘মোবাইল জুয়া’। কারণ হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল থাকলে যে কোনো স্থান থেকেও জুয়া খেলা যায়। এভাবে স্কুল-কলেজের মাঠ থেকে শুরু করে যে কোনো স্থানে মোবাইল জুয়ায় অংশ নিলে, পুলিশের ধরার উপায় নেই। তাই এলাকাবাসী ও অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে সবার আগে।

আরও পড়ুন

×