ছোট শিক্ষাঙ্গন, বড় স্বপ্ন
পাহাড়িয়াপাড়া আগামীর স্কুলমাঠে খেলায় মেতে ওঠা শিশু শিক্ষার্থীরা। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রঘুনাথপুর পাহাড়িয়াপাড়া গ্রামে। সম্প্রতি তোলা- সমকাল
কবীর উদ্দিন সরকার হারুন, ফুলবাড়িয়া
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫৯ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রঘুনাথপুর পাহাড়িয়াপাড়া গ্রাম। উপজেলা সদর থেকে দূরত্ব প্রায় ১৭ কিলোমিটার। ছায়া সুনিবিড় গ্রামটিতে মাটি, বাঁশ ও স্থানীয় উপকরণ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে একটি শিক্ষাঙ্গন। ফটক তৈরি করা হয়েছে বাঁশ দিয়ে। ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে মাটির দেয়ালের ‘এল’ আকৃতির ছোট্ট সেই শিক্ষাঙ্গন। এক পাশের দেয়ালে লেখা: পাহাড়িয়াপাড়া আগামীর স্কুল। সামনে সবুজ মাঠ। মাঠটির এক পাশে বাঁশের দোলনা। শ্রেণিকক্ষে বেঞ্চ-টেবিল-চেয়ার সবই বাঁশের তৈরি। কারুশিল্পীদের নিপুণ হাতে গড়া। গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ অক্ষুণ্ন রেখে এখানে জ্বালানো হয়েছে জ্ঞানের শিখা।
সকালবেলা সরব হয় এ শিক্ষাঙ্গন। চারপাশের গাছপালায় কিচিরমিচির করে হরেক রকম পাখি। এর সঙ্গে শোনা যায় শিশুদের সমবেত কণ্ঠস্বর। এখানে প্রাক্-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে ৫৮ শিশু। এটি হয়ে উঠছে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের আশার আলো।
প্রত্যন্ত গ্রামটি আখালিয়া নদী ও ফুতালারা বিলঘেরা। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ভালো ছিল না। সরকারি বিদ্যালয় এই গ্রাম থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। বিশেষ করে বর্ষায় কাদা ও দুর্গম পথের কারণে ছোট শিশুদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। এতে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী হতেন না। ছোট শিশু ও মেয়েদের একটি অংশ একটু বেশি বয়সেই বিদ্যালয়ে ভর্তি হতো।
যেভাবে শুরু
এই পরিস্থিতি বদলানোর উদ্যোগ নেন গ্রামের কয়েক শিক্ষিত তরুণ। তাদের ভাবনা ছিল, শিক্ষার সুযোগ যদি শিশুদের বাড়ির কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে বদলে যেতে পারে পুরো গ্রামের চিত্র।
তরুণেরা সামাজিক মাধ্যমে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা গ্রো ইয়োর রিডার ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর গ্রামবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যালয় নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেন।
সিদ্ধান্ত হয়, প্রচলিত ব্যয়বহুল নির্মাণসামগ্রীর পরিবর্তে নিজস্ব সম্পদ ও মানুষের শ্রমকে কাজে লাগানো হবে। ২০২৪ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ। কেউ নিজের ঝাড় থেকে বাঁশ দেন, কেউ জমি থেকে দেন মাটি, কেউ আবার স্বেচ্ছায় গায়ে খাটেন। স্থানীয় একটি পরিবার বিদ্যালয়টির জন্য দান করে ২৬ শতক জমি। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় শ্রমিকদের মজুরি এবং কারিগরি সহায়তা। পরের বছর ২০২৫ সালে শুরু হয় পাঠদান।
ব্যতিক্রমী নির্মাণশৈলী
প্রায় ২০ ইঞ্চি পুরু মাটির দেয়াল। মেঝে মাটির। ছাউনিতে ব্যবহার করা হয়েছে মাটির টালি। দরজা বাঁশের, জানালা বেতের তৈরি। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের চেয়ার-টেবিল-বেঞ্চও তৈরি হয়েছে বাঁশ দিয়ে। এমনকি বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও মাঠের দোলনাও বাঁশের তৈরি। শিক্ষার্থীদের ব্যাগের ক্ষেত্রেও পাটের মতো স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে।
খুদে শিশুদের স্বপ্নের হাতছানি
প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পাঠদান চলে। বর্তমানে প্রাক্-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মোট ৫৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি আনন্দময় পরিবেশে পাঠদানের চেষ্টা করেন শিক্ষকরা।
প্রাক্-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ১০০ টাকা, প্রথম শ্রেণিতে ১২০ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১৪০ টাকা নেওয়া হয়। শিক্ষক তিনজন–সেলিম আহমেদ, রেহেনা আক্তার ও সুমন মিয়া। তারা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যা পাওয়া যায় এবং সংস্থাটির সহায়তায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মিম আক্তার বলে, ‘আগে ইশকুল দূরে আছিল, হেই জন্য ইশকুলে পড়তাম না। এলাকায় মাদ্রাসা আছিল, সেইখানে পড়তাম। এহন এই ইশকুলে পড়ি। অনেক ভালো লাগে। স্যারেরা অনেক মজা কইরা পড়ায়। আমি পড়ালেখা কইরা ডাক্তার হইতে চাই।’
ধীরে ধীরে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের আশা
বিদ্যালয় নির্মাণে ২৬ শতক জমি দিয়েছে সুমন মিয়ার পরিবার। ডিগ্রি শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সুমন বর্তমানে বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।
সুমন বলেন, ‘রাস্তার সমস্যা দীর্ঘদিনের। এ কারণে ছোট শিশুরা দূরের স্কুলে যেতে পারে না। যেসব শিশু আগে স্কুলে যেতে ভয় পেত, অভিভাবকদের বুঝিয়ে তাদের আমাদের এখানে নিয়ে এসেছি।’ বিদ্যালয়টি ধীরে ধীরে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে।
গ্রো ইয়োর রিডার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সাদিয়া জাফরিন বলেন, ‘গুণগত শিক্ষাদানের জন্য পারদর্শী করতে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আমাদের স্বপ্ন–একদিন স্কুলের সব শিক্ষার্থী বড় বড় জায়গায় অধিষ্ঠিত হবে। পাহাড়িয়াপাড়া গ্রামের নাম ছড়িয়ে পড়বে বহুদূর।’
- বিষয় :
- শিক্ষাঙ্গন