ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নতুন ভবন হওয়ার কথা ছিল ২৮ মাসে, ৬৮ মাসেও হয়নি

নতুন ভবন হওয়ার কথা ছিল ২৮ মাসে, ৬৮ মাসেও হয়নি
×

নোয়াখালী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে দিনে গড়ে ভর্তি থাকেন ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী। নির্ধারিত সময়ে ১২ তলা ভিত্তির ওপর নতুন সাততলা ভবনের কাজ শেষ না হওয়ায় পুরোনো চারতলা ভবনেই গাদাগাদি করে চিকিৎসা দিতে হয় তাদের। শয্যা সংকটের কারণে বারান্দা, মেঝে, এমনকি সিঁড়িতেও বিছানা করে থাকতে হয় রোগীদের। 

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বহুল প্রতীক্ষিত নতুন ভবনের নির্মাণকাজ ২৮ মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৬৮ মাস পেরিয়ে গেলেও তা শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তর নোয়াখালী কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের দায়ী করেছেন। গণপূর্ত সূত্রের দাবি, ইতোমধ্যে ভবনের ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের ৪০ মাস বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়নি গণপূর্ত অধিদপ্তর। ফলে আধুনিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার লাখ লাখ মানুষ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণপূর্ত অধিদপ্তর নোয়াখালী কার্যালয় কাজটি বাস্তবায়নের জন্য ২০২০ সালে দরপত্র আহ্বান করে। ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ডেল্টা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনসোর্টিয়ামকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। নির্মাণকাজের জায়গা হস্তান্তর করা হয় ২০২০ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ঠিকাদার কাজ শুরু করেন ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি। কাজ শেষের সময়সীমা ধরা হয় ২৮ মাস।

স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন কর্মসূচির চতুর্থ এইচপিএনএসপি আওতায় চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির ‘অপারেশন অ্যান্ড ফ্যাসিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট’ (ওএফডি) শীর্ষক অপারেশনাল প্ল্যানের আওতায় নোয়াখালী জেলা হাসপাতালের মানোন্নয়ন ও সংস্কারকাজ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ১২তলা ভিত্তির ওপর ছয়তলা মূল ভবন নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ স্যানিটারি ও পানি সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ বিদ্যুতায়ন, পাম্পহাউসসহ ভূগর্ভে জলাধার, বিতরণ লাইন, নর্দমা ব্যবস্থা ও কম্পাউন্ড ড্রেন নির্মাণের কথা ছিল। শুধু মূল ভবন নির্মাণেই খরচ ধরা হয় ৫২ কোটি টাকা। প্রতি তলার আয়তন ২০ হাজার বর্গফুট। ২০২৪ সালের মে মাসে কাজটি সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজ শুরুর পাঁচ বছর আট মাস পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি। 

এ ছাড়া ভবনের এক্সটারনাল বৈদ্যুতিক কাজ, লিফট, জেনারেটর, সোলার প্লান্ট, মোটর সাপ্লাই, ফায়ার হাইড্রেন্ট ও পিএবিএক্সের জন্য আরও সাড়ে আট কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। ২০২৩ সালে এসব কাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অভি ইন্টারন্যাশনাল। 

২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন নোয়াখালীসহ পাশের লক্ষ্মীপুর ও ফেনী জেলার হাজারো মানুষ চিকিৎসার জন্য আসেন। শয্যার তুলনায় রোগী কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় বারান্দা ও মেঝেতে শয্যা পেতেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন শত শত রোগী। নতুন ভবন চালু হলে এ শয্যা সংকট অনেকটাই কেটে যেত। 
গত বৃহস্পতিবার ডায়রিয়া ওয়ার্ডে পাওয়া যায় সুবর্ণচরের শাহেদ উদ্দিনকে। তিনি হামের উপসর্গে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে তিন দিন ধরে এখানে আছেন তিনি। শাহেদ উদ্দিন বলেন, ‘হাসপাতালে বেড নেই। বাধ্য হয়ে বাচ্চাকে ফ্লোরে বিছানায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। নতুন বিল্ডিং হওয়ার কথা শুনে আসছি তিন বছর ধরে। কবে চালু হবে সেই নতুন বিল্ডিং, কেউ বলতে পারে না।’
বক্তব্যের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তর নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিবকে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। গত বৃহস্পতিবার কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর অফিস সহায়ক জানিয়েছেন, তিনি ঢাকায় মিটিংয়ে আছেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাশেদ হাসান চৌধুরীর দাবি, কাজের অগ্রগতি প্রায় ৭০ শতাংশ। ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ শেষ করতে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। নতুন ভবনের সাততলা 
পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অষ্টম তলার ছাদের ঢালাই হয়েছে। 

তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জুনে সরকারি এক পরিপত্রে পুরো প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বহিঃস্থ বিদ্যুতায়নের কাজসহ অন্যান্য কাজ ২০২৫ সালের নভেম্বরে আরেক পরিপত্রে শুরুর নির্দেশনা দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের মার্চে তা শুরু হয়েছে। চলতি বছর ভবনটি হস্তাস্তরের লক্ষ্য নিয়ে কাজ হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গত ৪ আগস্ট স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব শিরিন আক্তারের সই করা চিঠিতে হাসপাতালের নির্মাণাধীন ভবনের প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো ছাড়াই ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। 
নোয়াখালীর সিভিল সার্জন ও জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, রোগীদের ভিড় সামাল দিতে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে দিনে গড়ে রোগী ভর্তি থাকেন ৪০০-৫০০ জন। নতুন ভবন বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরকে বারবার 
তাগিদ দিয়েছেন; কিন্তু তারা পাত্তাই দিচ্ছে না। 
দুই সপ্তাহ আগেও নতুন ভবনটির আংশিক হস্তান্তরের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে অনুরোধ করেছেন। 

আরও পড়ুন

×