টাকায় মুক্ত হলো লুটের ৩৫ মহিষ
মাহামুদুর রহমান মাহমুদ, চকরিয়া (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
কক্সবাজারের মাতামুহুরীতে রাখালদের জিম্মি করে পাঁচ মালিকের ৩৫টি মহিষ লুট করেছিল দুর্বৃত্তরা। বিএনপির স্থানীয় নেতাদের চাপে ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করে এসব মহিষ ছেড়ে দেয় তারা। গত শুক্রবার রাত ১১টার দিকে উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নের রামপুরের একটি চিংড়ি ঘের থেকে এসব মহিষ লুট হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এক বছরে চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকা থেকে একই কায়দায় ৪০০ মহিষ লুটের ঘটনা ঘটে। মুক্তিপণ রেখে প্রায় অর্ধেক মহিষ চক্রটি ছেড়ে দিয়েছে। নানা চাপের মুখে মীমাংসা করতে বাধ্য হন খামারিরা। কিন্তু ভয়ে কেউই মুখ খুলতে চান না।
গত শুক্রবার রাতে লুট হওয়া ৩৫টি মহিষের মালিকেরা ঢেমুশিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের খাসপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন– হারুন অর রশিদ, মোসাদ্দেক হোসেন, ছাবের আহমদ, বাহাদুর ও এম. রহমান। সবারই সাতটি করে মহিষ ছিল বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, খামারিদের ৩৫টি মহিষ রামপুর ১১ একর বিশিষ্ট চিংড়িঘের এলাকার ৭ নম্বর স্লুইসগেটের পাশে ছিল। গত শুক্রবার রাত ১১টার দিকে ১০-১২ জন দুর্বৃত্ত অস্ত্রের মুখে রাখালদের জিম্মি করে ফেলে। পরে মহিষগুলো ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে মালুমঘাট ইউনিয়নের কাটাখালী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর গতকাল শনিবার দুপুরে মালিকেরা মহিষের সন্ধান পান। এ সময় কাটাখালী এলাকায় শত শত মানুষ জড়ো হন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, খামারিরা স্থানীয় বিএনপি নেতাদের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করেন। তাদের চাপে দুর্বৃত্তরা মহিষগুলো ছেড়ে দেয়। একটি সূত্রে জানা গেছে, এ সময় মহিষগুলো ছাড়ার বিনিময়ে তাদের ২০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। দুর্বৃত্তরা এ সময় থানায় কোনো অভিযোগ না করারও শর্ত দেয়।
মহিষের মালিক মোসাদ্দেক, ছাবের, হারুন, বাহাদুর ও রহমানের ভাষ্য, তাদের রাখালেরা প্রতিদিন ঘের এলাকার প্যারাবনের নির্দিষ্ট জায়গায় মহিষের পাল নিয়ে যান। দিনভর বিচরণ শেষে রাতে নির্ধারিত খামারে ফিরে আসে। খামারের কর্মচারীরা মহিষগুলো শুক্রবার রাতে বেঁধে রেখেছিলেন। ১১টার দিকে ১০-১২ জন সন্ত্রাসী তাদের জিম্মি করে ৩৫টি মহিষ নিয়ে যায়। মহিষ মালিকদের দাবি, তারা এই সন্ত্রাসীদের কাউকে চেনেন না।
নেপথ্যে ঘেরে ঘেরে চাঁদাবাজি
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক খামার মালিকের ভাষ্য, এই চক্রে শতাধিক সদস্য আছে। তারা চাঁদা দাবি করে। না দিলে রাতে এসে মহিষ নিয়ে যায়।
আব্দুর রহিম নামের এক চিংড়ি চাষির ভাষ্য, সন্ত্রাসী গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন মালুমঘাট ইউনিয়নের রিজার্ভ পাড়ার আজু খাঁ ও আহমদ হোসেন। তারা হত্যা-ডাকাতিসহ একাধিক মামলার ফেরারি আসামি। তবে রাত নামলেই চিংড়ি ঘের এলাকায় দলবল নিয়ে দাপিয়ে বেড়ায়। এই গ্রুপে চিরিংগা ইউনিয়নের চরণদ্বীপ ও সওদাগরঘোনা, মালুমঘাট ইউনিয়নের রিজার্ভপাড়ার কাটাখালী, ডুলাহাজারা ইউনিয়নের উলুবনিয়া এবং সাহারবিল ইউনিয়নের কোরালখালী এলাকার শতাধিক ব্যক্তি রয়েছেন।
মাতামুহুরী সাংগঠনিক উপজেলা বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সন্ত্রাসী গ্রুপটি বিগত সরকারের আমল থেকেই চিংড়ি ঘের এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা ঘের থেকে প্রতি জো-তে ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা চাঁদা আদায় করে। এই চাঁদা না পেয়ে ঘেরের মাছ, জালসহ খামারে পালিত ভেড়া ও মহিষ লুটে নেয়। এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নেতৃত্বে যারা আছেন, তারা আড়ালে থাকেন। তবে মাঠে থাকে অপরিচিত সন্ত্রাসীরা।
উপজেলা চিংড়ি ঘের মালিক সমিতির এক নেতার অভিযোগ, রাতে আসা সন্ত্রাসীদের অত্যাচার, চাঁদাবাজি ও মহিষ-ভেড়া লুটের ঘটনায় চিংড়ি চাষিরা অসহায়। প্রকৃতির বৈরী আচরণের কারণে চলতি মৌসুমে অধিকাংশ চাষি ঘেরে বিনিয়োগ করা পুঁজিই তুলতে পারেননি। এর মধ্যে এমন উপদ্রব চলছে। তাঁর ভাষ্য, উপজেলা আইনশৃঙ্খলা
কমিটির সভায় চকরিয়া থানার ওসি আশ্বাস দিয়েছিলেন, চাষিদের নিরাপত্তায় ঘের এলাকায় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন ও নৌযানের ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু এখনও তা করা হয়নি।
মহিষের খামার আছে এমন দুজন স্থানীয় রাজনীতিকের দাবি, চকরিয়া ও মাতামুহুরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এক বছরে প্রায় ৪০০ মহিষ লুটে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। মুক্তিপণ আদায় করে প্রায় অর্ধেক মহিষ তারা ছেড়ে দিয়েছে। অর্ধেকের বেশি মহিষ জবাই করে নানা জায়গায় মাংস পাচার করে দুর্বৃত্তরা। নানা চাপের মুখে খামারিরা মীমাংসায় বাধ্য হন। তাই ভয়ে তারা মুখ খুলতে চান না।
তথ্য নেই প্রশাসনের কাছে
কিছুদিন পর পর মহিষ-ভেড়া লুটের বিষয়ে তথ্য জানতে চকরিয়া থানায় যোগাযোগ করা হলে পুলিশ সূত্র জানায়, এসব বিষয়ে মামলা করেন না খামারিরা। যে কারণে তাদের কাছে গত এক বছরে কতগুলো লুটের ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে তথ্য নেই। এসব সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কাছেও। চকরিয়ার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (দুই উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত) ডা. আরিফ উদ্দিন বলেন, উপকূলীয় এলাকায় মহিষের খামারিরা ডাকাত ও চোরের আতঙ্কে আছেন। এ কারণে দিন দিন মহিষ পালনে তাদের মধ্যে আগ্রহ কমছে।
চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান গতকাল দুপুরে এ প্রতিবেদককে বলেন, তিনি মহিষ লুটের বিষয়টি শুনেছেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ থানায় অভিযোগ করেননি। পুলিশ অপরাধীদের শনাক্তের চেষ্টা করছে। তাদের আটকে অভিযান চলবে।
- বিষয় :
- লুটপাট