ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ধানের দর পতনে বিপাকে হাওরের লাখো কৃষক

ধানের দর পতনে বিপাকে হাওরের লাখো কৃষক
×

 পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ধানের দর পতনে বিপাকে পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রায় চার লাখ কৃষক। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী বোরো মৌসুমে চাষাবাদে আগ্রহ কমবে কৃষকের। ধান ব্যবসায়ীরা বলেছেন, একে তো ধানের দাম কমেছে, এর মধ্যে হাওরাঞ্চলের ধান এবার ‘ভালো নয়’ ‘পানির নিচের ধান’ এমন প্রচারণায় ক্রেতা হারিয়েছে। সব মিলিয়ে সর্বনাশ হয়েছে লাখো কৃষকের।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের শাফেলা গ্রামের বিপ্লব চন্দ গত বোরো মৌসুমে ২৫০ মণের মতো ধান পেয়েছেন। বৈশাখ মাসে সামান্য পরিমাণে ধান বিক্রি করেছিলেন তিনি। ওই সময় প্রতি মণ ধানে ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা পেয়েছেন। বেশি দাম পাওয়ার আশায় ১৫০ মণের মতো ধান শুকিয়ে গোলায় রেখেছেন। বললেন, এখন ধানের পাইকার পাচ্ছি না। ৭০০-৮০০ টাকার বেশি কেউ দাম বলে না।
তিনি বললেন, ‘আমাদের এলাকায় এক কেয়ার (৩০ শতক) জমি চাষাবাদে খরচ হয় ছয়-সাত হাজার টাকা। প্রতি কেয়ারে ধান পাওয়া যায় ১০ মণ। ৭০০ টাকা মণে ধান বিক্রি করলে খরচ উঠবে না।’
গৌরারং ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান শওকত আলী একজন গৃহস্থ। গত বোরো মৌসুমে তিনি ধান পেয়েছেন ৬০০ মণ। ৪৫০ মণ ধান তাঁর গোলায় এখনও আছে। গত বছর সর্বশেষ রমজান মাসে এক হাজার ৪০০ টাকা মণেও ধান বিক্রি করেনি তিনি। তাঁর ইচ্ছা ছিল আরও একটু বেশি দামে বিক্রি করবেন। এখন ধানের ক্রেতা পাচ্ছেন না। বললেন, ধানের ক্রেতা নেই, পাইকাররা ৬০০-৭০০ টাকা মণ দাম করে। তাও টাকা দেবে সিলেটে বা আশুগঞ্জে ধান পাঠিয়ে বিক্রি করার পর। এই অবস্থায় তিনি ধানের আশা ছেড়ে দিয়েছেন। বললেন, এভাবে চলতে থাকলে চাষাবাদে অনীহা বাড়বে।
জেলার শাল্লা উপজেলার বড় কৃষক হিসেবে পরিচিত শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছত্তার মিয়া। তিনি জানান, গত মৌসুমে জমি যা চাষাবাদ করেছিলেন, তাতে দুই হাজার মণ ধান পাওয়ার কথা ছিল। পেয়েছেন ৭০০ মণ। ধান শুকিয়ে গোলায় রেখেছেন বেশি দাম পাওয়ার আশায়। এখন তাঁর ধান পাইকাররা ৫০০ টাকা মণ দিতে চায়। তিনি বললেন, ‘আমি পাইকারদের জানিয়ে দিয়েছি, কয়েকশ হাঁস কিনব, ধান বিক্রি না করে হাঁসকে খেতে দেব। সামনের মৌসুমে ক্ষেত করব না।’

তিনি জানান, জমি ‘রংজমা’ বা বর্গাও আগামী মোসুমে দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। গেল মৌসুম পর্যন্ত ৩০ কেয়ার জমি ১০ হাজার টাকায় রংজমা হয়েছে। সামনের মৌসুমের জন্য পাঁচ হাজার টাকায়ও নিতে রাজি নয়। প্রান্তিক কৃষকরা উল্টো জানিয়ে দিচ্ছেন, চাষাবাদ করে লাভ কী, ধানই তো কেউ কিনছে না।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মদনপুর গ্রামের ধানের পাইকার আব্দুল্লাহ মিয়া বললেন, সিলেটে নিয়ে গেলে আড়তদাররা মণপ্রতি ৯৫০ টাকার বেশি দাম দেয় না। কৃষকরা ধান বিক্রির জন্য সকাল-বিকেল বাড়িতে আসেন। কিন্তু ধান নিচ্ছি না, ধান কেনার পর সব খরচ মিটিয়ে লাভ হয় না।

হাওরাঞ্চলের বড় ধানের আড়ত মধ্যনগরের ব্যবসায়ী গোপেশ দাস বললেন, গেল বছর সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যনগর আড়তে যে ধান এক হাজার ৩৭০ টাকা থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা মণে কেনা হয়েছে, এবার এসব ধান এক হাজার ১৮০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকায় কেনা লাগছে। একটু কালো বা হিজা (রং অনুজ্জ্বল) হলে ৫০০-৬০০ টাকার বেশি দিচ্ছে না ব্যাপারীরা। তিনি বলেন, প্রচার আছে, হাওরের ধান এবার মানে ভালো নয়, সব মিলিয়ে ধানের দাম কমে গেছে।
গত বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমি চাষাবাদ করে ১৩ লাখ টন ধানের উৎপাদন হয়েছিল। প্রতি মণ এক হাজার ৪৪০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে জেলায় ২১ হাজার টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। খাদ্য বিভাগ তাও পারেনি। তারা ধান কিনেছে ২০ হাজার টন। 
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা ফেরদৌস জাহানের কাছে প্রশ্ন ছিল, আপনারা এক হাজার টন ধান কম কিনলেন কেন, তিনি বললেন, আগস্টের ৩১ তারিখ পর্যন্ত ধান কেনার কথা ছিল। সারাদেশে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়ে যাওয়ায় ৯ আগস্ট ধান কেনা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি জানান, প্রথম দিকে গুদামের ধারণক্ষমতা কম থাকায় ধান কেনা যায়নি।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আহমদ আসিফুর রব বলেন, এই বিষয়ে অনেকে ফোন দিয়েছেন, পরে মিলারদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। তারা বলেছেন, এবার সুনামগঞ্জে ধানের রং নষ্ট হয়েছে। এ কারণে বাজারে দাম কমেছে। 

আরও পড়ুন

×