বন্যার পানি কমতেই সুপেয় পানির সংকট
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সড়ক ধরে হেঁটে চলেছেন বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষ। গতকাল বুধবার উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের বাজুমারা এলাকায় সমকাল
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১০ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘পানি কিছুটা কমলেও আমাদের কষ্ট একবিন্দু কমেনি, বরং নতুন বিপদে পড়েছি। ঘরের ভেতরে-বাইরে সব জায়গায় বিষাক্ত সাপ আর পোকামাকড় ভাসছে। রাত হলে ভয়ে দুচোখের পাতা এক করতে পারি না।’ অসহায়ত্ব নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের আব্দুল মজিদ। তিনি উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বকমারি গ্রামের বাসিন্দা।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, গত তিন দিনে পদ্মার পানি প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার কমেছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দুর্গত এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। উল্টো তা নতুন রূপ নিয়েছে।
বিশুদ্ধ পানির খুব কষ্টে আছেন জানিয়ে গতকাল বুধবার আব্দুল মজিদ বলছিলেন, আশপাশের গ্রাম ডুবে যাওয়ায় অনেক দূর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তারা অবিলম্বে শুকনো খাবার, পানি আর চিকিৎসার দাবি জানান।
চিলমারী ইউনিয়নের উদয়নগর গ্রামের গৃহিণী রহিমা খাতুনের ভাষ্য, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে ডায়রিয়া, আমাশয় আর চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়ছে। তারা সন্তানদের নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছেন। খাওয়ার পানি পর্যন্ত খুঁজে পাচ্ছেন না। বন্যাদুর্গত এলাকায় স্বাস্থ্যক্যাম্প স্থাপন ও খাদ্য সহায়তা দেওয়ার আকুতি জানান তিনি।
সাম্প্রতিক বন্যায় উপজেলার পদ্মাতীরের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে প্রায় এক হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এখনও পানিবন্দি। তারা আব্দুল মজিদ ও রহিমা খাতুনের মতোই দুর্ভোগে পড়েছেন। তাদের অভিযোগ, বেশির ভাগ এলাকায় চিকিৎসাসেবা ও সরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছায়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিনের ভাষ্য, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানিবাহিত রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যায়। এসব প্রতিরোধে চরাঞ্চলে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি দুটি ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম কাজ করছে। তারা সাপের কামড়ের কথা চিন্তা করে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত করেছেন। এ ছাড়া পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ জোরদার করা হচ্ছে।
ইউএনও অনিন্দ্য গুহ বলেন, ‘পদ্মার পানি কমতে শুরু করায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দুর্ভোগ মোকাবিলায় আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নসহ দুর্গম চরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর কাজ চলছে।’ এ ছাড়া স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানি ও গোখাদ্য সরবরাহের জন্য মেডিকেল টিমের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও পানিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।
বিজিবির সহায়তা
এদিকে দৌলতপুরের বন্যাদুর্গত অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে চিলমারী ইউনিয়নের বাংলাবাজার-উদয়নগর ও ভাগজত এলাকায় বিজিবির কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের (৪৭ বিজিবি) উদ্যোগে ৫০০ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়। এর মধ্যে চাল, ডাল, তেল, আটা ও লবণ রয়েছে।
বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন বিজিবি দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান, কুষ্টিয়া সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন ও কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের (৪৭ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি।
দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান বলেন, সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো বিজিবির ওপর অর্পিত দায়িত্বের অংশ। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তারা মানবিক সহায়তা দিয়ে যাবেন।