খুলনায় পিটিয়ে হত্যা
সন্দেহের কেন্দ্রে মেসের ম্যানেজার ও খুবির ৪ শিক্ষার্থী
খুবির খানজাহান আলী হল ফটকের বিপরীতে ইসলামনগর মসজিদ গলিতে সরোয়ার হোসেনের চার তলা মেস। এখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আজমল হোসেন। আজ রোববার তোলা ছবি: সমকাল
হাসান হিমালয়, খুলনা
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:৪১ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:৪৮
খুলনায় আজমুল হোসেন নামের এক ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় চার তলা ভবনের মেসের ম্যানেজার মেহেদী এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান চার শিক্ষার্থীসহ কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবার রাতে এ ঘটনায় নগরীর হরিণটানা থানায় মামলা করেছেন আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দীন। মামলার চার জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয় আরও ২০–২৫ জনকে আসামি করা হয়। তবে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
মামলার আসামিরা হলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফএমআরটি ডিসিপ্লিনের ১৭ ও ১৯ ব্যাচের রবিন ও মবিন, গণিত ডিসিপ্লিনের ১৯ ব্যাচের সাগর এবং এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের ২৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী ওবায়দুল। আজমুলের বাবা রোববার সন্ধ্যায় দাবি করেন, হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী মেসের ম্যানেজার মেহেদী। তবে এজাহারে তার নাম আসেনি।
এদিকে আজমুল হত্যার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে রোববার দুপুরে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেছেন খুবির শিক্ষার্থীরা। তারা দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
গত শুক্রবার রাতে চুরির অপবাদ দিয়ে আজমুলকে পেটানো হয়। এক পর্যায়ে আজমুল চার তলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে যান। হাসপাতালের নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। তিনি ছাদ থেকে লাফ দিয়েছেন, নাকি মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত শেষে চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা গ্রামের বাড়িতে আজমুলকে দাফন করা হয়।
আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দীন জানান, চুয়াডাঙ্গায় ২০২৪ সালে এইচএসসি পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করতে ঢাকায় যায় আজমুল। সেখান থেকে খুলনায় আসে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিয়ে ভর্তির সুযোগ পায়নি। তিনি বলেন, ‘মেহেদীর সঙ্গে ওর (আজমুল) পরিচয় হয়। মেহেদী বলে চার বছর পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট দিয়ে দেবে। এ নিয়ে এক লাখ ২০ হাজার টাকার চুক্তি হয়। কেউ এটি জানলে আজমুলকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। তখন আজমুল ফোনে আমাকে জানায়, সে ভর্তির চান্স পেয়েছে। আমি ছেলেকে বিশ্বাস করে ভর্তির টাকা দেই।’
কুতুব উদ্দীন আরও বলেন, ‘হঠাৎ শুনতে পাই আমার ছেলে চান্স পায়নি। সে স্বীকার করে এবং বলে বিদেশ চলে যাবে। শেষ পর্যন্ত সে নর্থ ওয়ের্স্টান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এ বিষয়টা মেহেদী জানতে পারে। আজমুল গত বৃহস্পতিবার বাড়িতে গিয়েছিল। ওই দিন ১২টার দিকে তাকে ফোন করে ৫৮ হাজার টাকা চায় মেহেদী। আজমুল তখন মেহেদীকে বলে ২৩ হাজার টাকা আছে। ওই টাকা পাঠিয়ে দ্রুত খুলনায় চলে আসতে বলে মেহেদী।’ কুতুব উদ্দিন দাবি করেন, ‘মেহেদী আমার ছেলেকে ডেকে নিয়ে গেছে এবং সব প্রকাশ করে দেবে এই ভয়ে তাকে মেরে ফেলেছে।’

আজ রোববার ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ছাত্র হলের পাশে আবাসিক এলাকা। হলে যারা আসন পান না, তাদের বেশিরভাগই ওই এলাকায় ভাড়া থাকেন। খুবির খানজাহান আলী হল ফটকের বিপরীতে ইসলামনগর মসজিদ গলিতে সরোয়ার হোসেনের চার তলা ভবনের চতুর্থ তলায় অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থাকতেন আজমুল।
নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার ৫ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তারা জানান, মেহেদীকে তারা গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে জানেন।
মালিকের পক্ষে তিনি প্রতি মাসে ভাড়া আদায় করেন। ওই ভবনে জিনিসপত্র প্রায়ই চুরি হতো। ওই সড়কের অন্যান্য মেসেও প্রায়ই চুরি হয়।
চুরির ঘটনায় শুক্রবার রাতে মেহেদী ও অন্য ছাত্ররা আজমুলকে মারধর শুরু করে। চোর ধরা পড়েছে শুনে আশপাশের মেস থেকেও ছাত্ররা আসে। একপর্যায়ে ছাদে নিয়ে তাকে আবারও মারপিট করা হয়। অনেকেই তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও পারেনি। ওই ভবনের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘চোর ধরা পড়েছে শুনে আশপাশের মেসের লোকজনও ছাদে এসে আজমুলকে জিনিসপত্র ফেরত দিতে বলে। একপর্যায়ে তার বাবাকে ফোন দিয়ে টাকা দাবি করা হয়। কিন্তু কিভাবে ছাদ থেকে পড়েছে আমরা জানি না।’

রোববার ভবনে গিয়ে মেহেদীর কক্ষ তালাবদ্ধ পাওয়া গেছে। তার মোবাইল নম্বরও বন্ধ।
নর্থ ওয়েস্টার্নের ইংরেজি বিভাগের প্রধান মেহেদী হাসান জানান, ‘আজমুল গত ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এ পর্যন্ত মাত্র তিন দিন ক্লাস করেছেন। মৃত্যুর খবর শুনে আমরা মর্গে গিয়ে তার পরিবার এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’
নগরীর হরিণটানা থানার ওসি ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আজমুলের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা হয়েছে। আমরা প্রতিটি তথ্য যাচাই করে দেখছি। ঘটনায় জড়িতরা দ্রুত গ্রেপ্তার হবে। নিরীহ কেউ যাতে হয়রানী না হয়, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
খুলনা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘মৃত্যুও শোকে প্রথম দিন আজমুলের বাবা কোনো তথ্য দিতে চাননি। মামলা করতেও রাজি হচ্ছিলেন না। তাৎক্ষণিক তদন্তে যাদের নাম পাওয়া গেছে তাদের আসামি করা হয়েছে। তদন্তে মেহেদীসহ অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদেরও গ্রেপ্তার করা হবে।’
- বিষয় :
- খুলনা