ঢাকা রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত মান রক্ষায় শক্তিশালী স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জরুরি

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত মান রক্ষায় শক্তিশালী স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জরুরি
×

ছবি-সংগৃহীত

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:৫১ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:৫৫

সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও মালিকপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং পেশাগত মানদণ্ড বজায় রাখতে গণমাধ্যমে শক্তিশালী স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা। তাঁদের মতে, এর মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের প্রতি পাঠক, দর্শক ও শ্রোতার আস্থা জোরদার করা সম্ভব।

সম্পাদকীয় নীতিমালার কার্যকর চর্চা, পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং পাঠক-দর্শকের জন্য কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গণমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিতের বাস্তব পথ হতে পারে বলেও মত দেন তাঁরা। একই সঙ্গে স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য রেখে নৈতিক সাংবাদিকতা চর্চার ওপর গুরুত্ব দেন অংশগ্রহণকারীরা।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পেশাগত ও নৈতিক মানোন্নয়নের পথ এবং সংবাদমাধ্যমে স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করার সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে রোববার খুলনা বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় এসব কথা উঠে আসে। মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত এ সভা হাইকমিশন অব কানাডা ইন বাংলাদেশের অর্থায়নে কানাডা ফান্ড ফর লোকাল ইনিশিয়েটিভের আওতায় ধারাবাহিক সংলাপ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় সংবাদমাধ্যমের মালিক ও প্রকাশক, সম্পাদক, সংবাদ সিদ্ধান্তগ্রহীতা, সাংবাদিক ইউনিয়ন ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, সংস্থাটির পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংবাদমাধ্যম সংস্কারে স্ব-নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।

সভায় দেওয়া উপস্থাপনায় তিনি বলেন, ‘সেলফ-রেগুলেশন যত কার্যকর হবে, সংবাদমাধ্যমে বাহ্যিক হস্তক্ষেপ তত কমবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তার আস্থার ওপর নির্ভরশীল। যতক্ষণ পর্যন্ত পাঠক, শ্রোতা, দর্শকের গণমাধ্যমের ওপর আস্থা থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবে। এই আস্থার জন্য সংবাদমাধ্যমগুলোকে তাদের নিজেদের জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে।’

সংবাদকর্মীদের পাশাপাশি সম্পাদক ও মালিকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি প্রণয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন হাসিবুর রহমান।

অনুষ্ঠানে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, ‘সরকারের কাছে দাবি জানাই খুব দ্রুত পরিকল্পনা প্রকাশ করুন আপনারা কেমন গণমাধ্যম কমিশন চান। আমরা বলতে চাই, আমরা এমন একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন চাই যেখানে আমরা আমাদের ভুল নিজেরাই সংশোধন করব।’

সাইবার সুরক্ষা আইনে কথিত অপরাধগুলোর যথাযথ সংজ্ঞায়ন ছাড়াই সাজা বাড়ানোর উদ্যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমের সামগ্রিক সংস্কার নিয়ে কাজ করতে হবে। সামগ্রিক সংস্কার না হলে বর্তমানের এই নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি আরও বাড়তে পারে। শুধু শাস্তি বাড়িয়ে বা আইন কঠোর করে কখনো কোনো জায়গার পরিস্থিতির উন্নতি করা যায়নি।’

একই সঙ্গে আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সাংবাদিকতা যেন সেলফ সেন্সরশিপের দিকে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার কথাও বলেন তিনি।

মুক্ত আলোচনায় দৈনিক গ্রামের কাগজের সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন বলেন, সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক মূলনীতি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এমন সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে সংবাদমাধ্যমগুলো নিজেদের কর্মীদের সুরক্ষা দিতে, পেশাগত মান বজায় রাখতে এবং ব্যক্তিগত বা পেশাগত ক্ষতির ঝুঁকি থাকলেও অনৈতিক বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

আলোচকরা বলেন, টেকসই স্ব-নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রয়োজন, যা সরকার, মালিকপক্ষ, বিজ্ঞাপনদাতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।

মানব সেবা ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শামীমা সুলতানা শীলু বলেন, সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের সুযোগ না থাকে। সাংবাদিকতায় প্রবেশের আগে যথাযথ প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পেশাগত নৈতিকতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।

সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নৈতিক সাংবাদিকতা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এ জন্য গণমাধ্যম মালিকদের সময়মতো বেতন, আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র, আইনানুগ সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব হেদায়েত হোসেন মোল্লা বলেন, গণমাধ্যমে আর্থিক বিষয়ে স্বচ্ছতা ও সততার ঘাটতি রয়েছে। কর্মীদের অধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। তিনি একটি সর্বজনীন ও আইনসম্মত নিয়োগপত্রের কাঠামো তৈরিরও দাবি জানান।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান সারা মনামী হোসেন বলেন, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অনেক তথ্য নয়, প্রয়োজনীয় ও নির্ভরযোগ্য তথ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্য বা ঘটনা প্রকাশের আগে সেটি আদৌ সংবাদযোগ্য কি না, সেই প্রশ্নও করতে হবে।

সভায় আরও বক্তব্য দেন দৈনিক লোকসমাজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আনোয়ারুল কবির নান্টু, দৈনিক কল্যাণের সম্পাদক একরাম-উদ-দৌলা, দৈনিক মাথাভাঙ্গার সম্পাদক ও প্রকাশক সরদার আল আমিন, দৈনিক সময়ের খবরের সম্পাদক ও প্রকাশক মো. তরিকুল ইসলাম, দৈনিক প্রবাহের সহকারী সম্পাদক খালিদ হোসেন, সাংবাদিক গৌরাঙ্গ নন্দী, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহকারী মহাসচিব এহতেশামুল হক শাওন, রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম খোকন, রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক, প্রত্যাশা সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মো. বিল্লাল হোসেন, অগ্রগতি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আবদুস সবুর বিশ্বাস এবং লিডার্স সাতক্ষীরা প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর শারমিন আরা লিনা।

আরও পড়ুন

×