ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

জীবনের সঙ্গে লড়ছেন আলাউদ্দিন

‘সকালে ও দুপুরে পানি দিয়া বনরুটি খাই’

‘সকালে ও দুপুরে পানি দিয়া বনরুটি খাই’
×
×

মো. আলাউদ্দিন

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:২৯

ডোরাকাটা একটি প্রিন্টের শার্ট পরেছেন মো. আলাউদ্দিন। তার দেহের তুলনায় শার্টটি অনেক বড়। আবার শার্টের তুলনায় দুই পাশে বড় দুটি পকেট। কাঁধে ঝুলছে একটি বক্স, যাতে থরে থরে সাজানো সিগারেট ও পান। ‘পকেট দুটো এত বড় কেন চাচা’– মুচকি হেসে ষাটের কাছাকাছি আলাউদ্দিন বললেন, ‘একটাতে পান বেচার টাকা রাখি, আরেকটাতে রাখি সিগারেট বেচার টাকা। রাইতে হিসাব করতে সুবিধা হয়।’ কত টাকার বেচা হয় প্রতিদিন, সারাদিন কী খান– এ প্রশ্নে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘১১০০-১২০০ টাকা বেচলে একশ-দেড়শ টাকা লাভ থাকে। প্রতিদিন সকালে ও দুপুরে পানি দিয়া বনরুটি খাই। রাইতে সবজি দিয়া ভাত খাই। তবু কুলাইতে পারি না। সবকিছুর দাম বাড়নে আমার খাওনেই দিনে চইলা যায় ১২০ টেকার বেশি। ছয় মাস আগেও একই খানার খরচ আছিল মাত্র ৮০ থেকে ৯০ টাকা।’ 

অভিন্ন কথা বললেন অটোরিকশাচালক মোস্তফা কামালও। তিনি বলেন, ‘হালিশহরে আট বছর ধরে অটো চালাই। দিনে ১৫ ঘণ্টা রিকশা চালালে মাস শেষে আগে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা থাকত। সবকিছুর দাম বাড়াতে থাকায় এখন কিছুই থাকে না। দুই মেয়ে ও তার মারে আগামী মাসে দেশের বাড়ি পাঠাইয়া দিমু। ঘর ভাড়া দিয়া তাদের আর শহরে রাখতে পারব না।’

মোস্তফার সঙ্গে গত শুক্রবার কথা হয় হালিশহরের চুনা ফ্যাক্টরি মোড়ে। আর নগরীর বড় পোল মোড়ে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেখা হয় আলাউদ্দিনের সঙ্গে। প্রতিদিন এই সময়ে পান, বিড়ি ও সিগারেট বিক্রি করেন তিনি। বড়পোল নগরীর ব্যস্ততম একটি মোড়। এটির একদিকে গেছে আগ্রাবাদ অ্যাকসেস রোড; অন্য দুই সড়কের একটি গেছে বন্দরের দিকে, আরেকটি হালিশহরের দিকে। সন্ধ্যা হলে গণপরিবহন বেশি থাকে এই মোড়ে। তাই তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় পান-সিগারেটের পসরা নিয়ে এখানেই রুটি-রুজি খোঁজেন।

পুলিশ বক্সের সামনে থাকা টেম্পোস্ট্যান্ড থেকে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিলেন এই হকার। কথার মাঝে বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন তিনি। ‘চাচা, ছেলেমেয়ে কি আপনার খবর রাখে না’– প্রশ্ন শুনে আলাউদ্দিন বললেন, ‘আমার এক মেয়ে ও দুই ছেলে। মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। ছেলেদের মধ্যে সাকিবের বয়স ২৮ বছর। সাকিলের বয়স ২২ বছর। তারা নিজেরা নিজেদের নিয়ে আছে। আমি আছি আমারে নিয়া।’

এসব কথা বলে কিছুক্ষণ থামলেন আলাউদ্দিন। আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন খুঁজলেন! মাথা নামিয়ে পরে আবার বললেন, ‘এই চট্টগ্রামে আছি ৩০ বছর ধরে। রাজমিস্ত্রির কাজ করতাম আগে। ৬০ টাকা দিয়ে শুরু করে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেতন পাইছি একসময়। শরীরে এখন আর কুলায় না। তিন বছর হলো সেইটা ছাইড়া এই পান-সিগারেট বেচি। ছেলেমেয়েরা আগে খবর নিত। এখন আর নেয় না। সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী আছেন। আমি খাইয়া-দাইয়া কিছু থাকলে তার জন্য কিছু পাঠাই।’

আপনি খাওনের পর আর কত টাকা থাকে মাসে– প্রশ্ন বাতাসে থাকতেই আলাউদ্দিন বললেন, ‘আগে মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টেকা থাকত। এখন থাকে না। সবকিছুর দাম বাড়তাছে। ছয় মাস আগেও বনরুটির দাম ছিল ১০ টেকা। এখন ১৫ টাকা। সবজি দিয়া ভাত খাইলেও আগের চেয়ে ২০ টেকা বেশি নেয় এখন।’
কোথায় থাকেন, কীভাবে থাকেন– এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন অসহায় মানুষটি। জর্দা ছাড়া একটা পান কিনে আলাপ জমালাম আবার। বললেন, ‘হালিশহরের বউবাজারে থাকি। দিনের বেলায় দারোয়ানের কাজ করি। রাত হলে পান-সিগারেট বেচি। যে ভবনে থাকি, সেখানে খাওনের ব্যবস্থা নাই। তাই পান-সিগারেট বেইচা যা পাই, তা দিয়া আমি কিছু খাই।’

বনরুটি কি প্রতিদিন খান? ‘বনরুটি আমার পছন্দ। দামও কম। পেটও তাড়াতাড়ি ভরে। পানি দিয়াই খাওন যায়। এইটা না পাইলে পাউরুটি খাই পানি দিয়া। ভাত খাই শুধু রাইতে। দুই বেলা ভাত খাইলে দোকানের চালান শেষ হইয়া যায়,’ বলেন তিনি।

আলাউদ্দিন জানালেন, চার হাজার টাকা বিনিয়োগ করে এই পান-সিগারেট বেচেন তিনি। প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা বেচা হয়। নিজের খাবার খরচ ১০০ টাকার নিচে রাখার চেষ্টা করেন তিনি। প্রতিদিন নতুন করে পান ও সিগারেট কেনেন তিনি হাজারখানেক টাকার। মাঝেমধ্যে শরীর খুব অসুস্থ হয়ে যায় তার। ভালোও হয়ে যায় নিজে নিজে। শেষ কবে ডাক্তার দেখিয়েছেন, তিনি তা বলতে পারলেন না। শেষ কবে তিনবেলা ভাত খেয়েছেন, তাও মনে করতে পারেননি।

মোস্তফার পরিবার

খরচ কুলাতে না পেরে বাড়ি চলে যাচ্ছে মোস্তফার পরিবার
মোস্তফার বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। ১০ বছর আগে চট্টগ্রাম শহরে এসেছেন তিনি। তার এক হাত ও এক পা কাজ করে না। জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী হলেও মোস্তফা জীবনযুদ্ধে হাল ছাড়েননি। অটোরিকশার গতিময় হ্যান্ডেল ধরে গ্রামের বাড়ি থেকে পরিবারকেও শহরে এনেছিলেন তিনি। পরিবার বলতে তার আছে স্ত্রী সুমা আক্তার ও দুই শিশুকন্যার। 

বড় মেয়ের নাম রুমা আক্তার, বয়স সাত। ছোট মেয়ে জান্নাত, বয়স চার। ক্রমবর্ধমান খরচের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে দুই সন্তানসহ তার স্ত্রীকে গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মোস্তফা। তিনি বললেন, ‘বড় মেয়েটাকে শখ করে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছি। তার পেছনে প্রতি মাসে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। তারপরও দুই বছর পড়াইছি। এখন আর পারব না। মাদ্রাসা থেকে বলছে, আরও এক হাজার টাকা খরচ বাড়বে। এদিকে ছোট মেয়েও স্কুলে যাইতে চায়। তার জন্য, আবার টাকা লাগবে। আমার তো এত টাকা নাই। ওদের তাই বাড়ি পাঠাই দিমু আগামী মাসে।’

আর কোথায় কত টাকা খরচ বাড়ল আপনার– জিজ্ঞেস করতেই মোস্তফা বললেন, ‘খরচ কোথায় বাড়ে নাই, হেইডা জিগান মামা। আগে ঘর ভাড়া দিতাম সাড়ে তিন হাজার টেকা। এখন সেইটা সাড়ে চার হাজার টাকা। মেয়ের মাদ্রাসায় আগে খরচ হতো দেড় হাজার টাকা। এখন হচ্ছে আড়াই হাজার টাকা। গাড়ির যে কাজ আগে ২০০ টাকা দিয়া করাতাম, হেইডা করতে এখন ৪০০ টাকা চায়। যে লইট্টা মাছ ছয় মাস আগেও দেড়শ টাকা দিয়া কিনছি, তা এখন ৩০০ টাকা নেয়। কই যামু কন? আমাদের ভাড়া তো আর অত বাড়ে না।’ ছয় মাস আগের তুলনায় সব মিলিয়ে আপনার আয় ও ব্যয় কত বেড়েছে– এমন প্রশ্ন মোস্তফা বললেন, আগে সব মিলিয়ে খরচ হতো মাসে ৮-১০ হাজার টাকা। এখন লাগে ১৪-১৫ হাজার টাকা। ছয় মাস আগে গড়ে প্রতি মাসে ইনকাম হইত ১৫-১৬ হাজার টাকা। এখন হয় ১২-১৪ হাজার টাকা। ইনকাম কইমা গেছে। কিন্তু খরচ বাইড়া গেছে। বেশির ভাগ সময় একটা ডিম ভাজি দিয়া ভাত খাইয়া ফেলি সবাই।’

জাতীয় খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকায় যা আছে
একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির পুষ্টি চাহিদা তার দৈনিক পরিশ্রম ও দেহের ওজনের ওপর নির্ভর করে। খাবার পুষ্টিকর করার জন্য মোট ক্যালরির ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিভিন্ন প্রকার কার্বোহাইড্রেট থেকে, ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ স্নেহ পদার্থ থেকে এবং ১৫ থেকে ২০ শতাংশ প্রোটিন থেকে গ্রহণ করা উচিত বলে উল্লেখ আছে জাতীয় খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকায়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ২৭০ থেকে ৪৫০ গ্রাম চাল, আটা, ভুট্টা গ্রহণ করা উচিত। এর সঙ্গে ৩০০ থেকে ৬০০ গ্রাম শাকসবজি এবং ১৫০ থেকে ৩৫০ গ্রাম মাছ, মাংস, ডিম খেতে হবে। এ ছাড়া সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষকে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪৫ মিলি তেল ও চর্বি এবং ৩০ থেকে ৬০ গ্রাম ডালজাতীয় খাদ্যও খেতে হবে। 

যা বলছেন পুষ্টিবিদ 
চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের সাবেক পুষ্টিবিদ হাসিনা আক্তার বলেন, আমাদের শরীরের ৪ শতাংশ তৈরি নানা ধরনের খনিজ পদার্থ দিয়ে। ৭৫ কেজি ওজনের একজন মানুষের শরীরের তিন কেজি হলো খনিজ। দেহের গঠন, বিপাকক্রিয়ার নানা জটিল রসায়নে ও নানা ধরনের শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমে অংশ নেয় এসব খনিজ পদার্থ। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেহে কোনো খনিজ তৈরি বা উৎপাদিত হয় না। ফলে পুরোটাই গ্রহণ করতে হয় খাদ্যের মাধ্যমে। তাই খনিজ বা মিনারেল হলো খুব দরকারি পুষ্টি উপাদান। 

তিনি আরও জানান, দেহের জন্য দরকারি খনিজগুলো হলো দুই ধরনের– ম্যাক্রোমিনারেল, মানে যেগুলো দৈনিক কমপক্ষে ১০০ মিলিগ্রামের বেশি পরিমাণে দরকার হয়, যেমন– ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার ইত্যাদি। আর মাইক্রোমিনারেল লাগে খুব অল্প পরিমাণে, যেমন– আয়োডিন, জিঙ্ক, ম্যাঙ্গানিজ, ফ্লুরাইড, কপার, সেলেনিয়াম ইত্যাদি। এসব চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ না হলে একজন মানুষ ক্রমে দুর্বল হবে এবং রোগাক্রান্ত হবে। 

আরও পড়ুন

×